আঙুর ফলের উপকারিতা ও অপকারিতা (২০২২)

Grapes_আঙুর ফলের উপকারিতা ও অপকারিতা

বিদেশী ফল আঙুরকে ফলের রানী হিসেবে অভিহিত করলেও ভুল হবে না। দেশীয় ফলের মতোই জনপ্রিয় এই ফল। এটি দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি খেতেও সুস্বাদু। ভিটামিন সি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানে ভরপুর আঙুরের চাহিদা আমাদের দেশে ব্যাপক। বেশিরভাগ মানুষই আঙুর ফলের উপকারিতা না জেনেই এই ফল গ্রহণ করছে। চলুন আপনার আঙুর গ্রহণের সিদ্ধান্তটা যে কেন ভুল নয়, তার যুক্তিযুক্ত কারণ গুলো জেনে নেই –

Table of Contents

আঙুরের পরিচিত

কখনো ভেবে দেখেছেন কীভাবে এই সুস্বাদু ফলটি আমাদের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হলো? হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ আঙ্গুর চাষ করেছে। ধারনা করা হয়, প্রাচীন সভ্যতায় মদ তৈরির প্রধান উপকরণ হিসেবে আঙুরের চাষাবাদ শুরু হয়। পরে দেখলো যে, সুস্বাদু ও মিষ্টি স্বাদের ফলটি আপনি এমনি এমনি খেতেও কম স্বাদ নয়। সবুজ, লাল, কালো, হলুদ এবং গোলাপী সহ বিভিন্ন রঙের আঙুর পাওয়া যায়। আধুনিক সভ্যতায় আঙুর দিয়ে কিশমিশ, জেলি থেকে জুস পর্যন্ত তৈরি করছে। আঙুর ফলের উপকারিতা সম্পর্কে আরো বিস্তর জানতে আর্টিকেলটি পড়তে থাকুন।

আঙুরের পুষ্টিগুণ 

আপনার পছন্দের আঙুরে কোন উপাদান কি পরিমাণে আছে তা জানেন কি? আপনি অবাক হবেন যে, আঙুর উচ্চ পুষ্টি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে আঙুর ফলের উপকারিতা বেশ লক্ষনীয়। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার (ইউএসডিএ) অনুসারে, এক কাপ লাল বা সবুজ আঙ্গুরের ওজন প্রায় ১৫১ গ্রাম যা থেকে প্রায় ১০৪ কিলোক্যালরি পাওয়া যায়।এতে বিদ্যমান অন্যান্য উপাদানগুলো হচ্ছে-

উপাদান
পরিমান
প্রোটিন
১.০৯ গ্রাম
চর্বি
০.২৪ গ্রাম
শর্করা
২৩.৩৭ গ্রাম
ফাইবার
১.৪ গ্রাম
পটাসিয়াম 
২৮৮ মিলিগ্রাম
ক্যালসিয়াম
১৫ মিলিগ্রাম 
ফসফরাস 
৩০ মিলিগ্রাম 
সোডিয়াম 
৩ মিলিগ্রাম
জিংক
০.১১ মিলিগ্রাম 
লোহা
০.৫৪ মিলিগ্রাম 
ভিটামিন সি
৪.৮ মিলিগ্রাম
ভিটামিন কে
২২ মাইক্রোগ্রাম
ম্যাগনেসিয়াম
১১মিলিগ্রাম

আঙুরে ভিটামিন বি এবং এ রয়েছে। এতে পানির পরিমাণ বেশি। এক কাপ আঙ্গুরে ১২১ গ্রামের বেশি জল থাকে। এতে বিদ্যমান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যেমন লুটিন এবং জেক্সানথিন বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক কাজ করে থাকে। এছাড়া ফ্ল্যাভোনয়েড, মাইরিসেটিন ও কোয়ারসেটিনও আঙ্গুরে পাওয়া যায় যা শরীরে ক্ষতিকারক ফ্রি র‌্যাডিক্যাল গঠন প্রতিরোধে সাহায্য করে।

আঙুর ফলের উপকারিতা ও অপকারিতা
আঙুর ফলের উপকারিতা ও অপকারিতা

কীভাবে আঙুর আপনার খাদ্যতালিকায় যুক্ত করবেন?

সারাবছর ব্যাপী পাওয়া যায় এমন একটি ফল যদি আপনি আপনার খাদ্যতালিকায় যুক্ত করার কথা ভেবে থাকেন, তবে নিঃসন্দেহে আঙুর যোগ করতে পারেন। বাজার থেকে তাজা আঙুর কিনে রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করে বেশ কয়েকদিন অনায়াসে খেতে পারেন। তাজা ফল হিসেবে আঙ্গুর খাওয়ার সবচেয়ে ভালো। তবে মুখের রুচি বৃদ্ধির জন্য জেলি, জুস বা কিশমিশ হিসেবেও গ্রহণ করতে পারেন।

ডায়েটে আঙ্গুর অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আরো কিছু সহজ টিপস রয়েছে:

  • আঙ্গুর অর্ধেক করে কেটে মুরগির সালাদে যোগ করুন।
  • তাজা আঙ্গুর, আনারস, কাটা পীচ এবং স্ট্রবেরি দিয়ে একটি ফলের ককটেল তৈরি করুন।
  • আঙ্গুর হিমায়িত করুন এবং গরমের দিনে স্ন্যাকস বা ডেজার্ট হিসাবে খান।
  • ১০০ ক্যালোরি স্ন্যাকের জন্য এক কাপ তাজা আঙ্গুর খান।

আঙুর ফলের উপকারিতা 

আপনার যদি আঙুর ফল পছন্দের হয়ে থাকে, তবে আপনার অবশ্যই আঙুর ফলের উপকারিতা সম্পর্কে জানা উচিত। না জেনে কেন আপনি এটি গ্রহণ করার সিধান্ত নিবেন বলুন তো! চলুন আঙুর ফলের উপকারিতা সম্পর্কে বিশদভাবে জেনে নেই –

১. ভিটামিন ও খনিজ লবণের ভান্ডার

আঙ্গুর ফলের উপকারিতা সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই আসে এটি দেহের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণের ভান্ডার। এটি জিংক, ভিটামিন-এ, ভিটামিন কে, ভিটামিন সি তে সমৃদ্ধ। একদিকে শক্তি উৎপাদনে জিংক একটি অপরিহার্য খনিজ, অন্যদিকে ভিটামিন কে রক্ত ​​জমাট বাঁধা এবং সুস্থ হাড়ের জন্য অত্যাবশ্যক।

এছাড়াও আঙুর থায়ামিন, রাইবোফ্লাভিন, বি৬ এর মতো বি ভিটামিনের ভালো পরিমাণ সরবরাহ করে । থায়ামিন এবং রাইবোফ্লাভিন উভয়ই বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য এবং বি৬ প্রধানত প্রোটিন বিপাকের জন্য প্রয়োজন।

২. হার্টের স্বাস্থ্য উন্নত করে

হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলছে। উচ্চরক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এর মাত্রা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। হৃদরোগীদের জন্য আঙুর মহাঔষধ হিসেবে কাজ করে। আঙ্গুর বিভিন্ন উপায়ে হার্টের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে। এক কাপ (১৫১ গ্রাম) আঙ্গুরে পটাসিয়াম থাকে ২৮৮ মিলিগ্রাম। এই খনিজ পদার্থটি স্বাভাবিক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

পটাসিয়াম প্রাথমিকভাবে আপনার ধমনী এবং শিরা প্রসারিত করে যা রক্তের চাপ কমাতে সাহায্য করে। 

যাইহোক, ৩২ টি গবেষণা পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, আঙ্গুরের মধ্যে যে যৌগগুলি পাওয়া যায়, তা রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে পারে।

৩. উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ

আঙ্গুর বেশ কিছু শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সর্বোচ্চ পাওয়া যায় আঙুরের ঘন ত্বকে এবং বীজে। কিছু আঙ্গুরের জাতে অ্যান্থোসায়ানিন উচ্চ পরিমাণ থাকে। গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, অ্যান্থোসায়ানিন মস্তিষ্ক এবং হৃদরোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করতে সাহায্য করে।

এই ফলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হল রেসভেরাট্রল এবং কোয়ারসেটিন, যা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা এবং ক্যান্সার এর ঝুকি কমায়। এছাড়া আঙ্গুরে ভিটামিন সি, বিটা ক্যারোটিন, লুটেইন এবং এলাজিক অ্যাসিডও রয়েছে, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। 

৪. ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়

আঙ্গুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি নানা ধরনের ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে। রেসভেরাট্রল আঙুরের  একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এমনকি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং আপনার শরীরে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তারকে বাধা দেয়। 

আঙ্গুরে কোয়েরসেটিন, অ্যান্থোসায়ানিন এবং ক্যাটেচিন অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে, যার সবকটিতেই ক্যান্সার-প্রতিরোধী প্রভাব আছে। ল্যাব ও মানুষের উপর করা গবেষণায় দেখা গেছে যে, আঙ্গুরের রস মানুষের কোলন এবং স্তন ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি এবং বিস্তারকে বাধা দিতে পারে। মূলকথা, আঙ্গুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি একাধিক ধরণের ক্যান্সারের বৃদ্ধি এবং বিস্তার রোধ করতে পারে, যদিও এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব রয়েছে। 

৫. রক্তে শর্করা মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখে

আঙ্গুরে প্রতি কাপে ২৩ গ্রাম চিনি থাকে। আপনি ভাবতে পারেন তাহলে এটি কীভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা কমায়। তাহলে এই নিন আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর। আঙুর আপনার

  • ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে
  • আপনার অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ রক্ষা করে, যা ইনসুলিন তৈরি করে
  • ইনসুলিন উৎপাদন তরান্বিত করে
  • কোষের ঝিল্লিতে গ্লুকোজ রিসেপ্টরের সংখ্যা বৃদ্ধি করে

আপনার ডায়াবেটিস ঝুঁকি কমাতে এবং ডায়াবেটিস সম্পর্কিত জটিলতা প্রতিরোধের জন্য সময়ের সাথে সাথে আঙুর গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

৬. দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় ও চোখের রোগ প্রতিরোধ করে

আঙ্গুরে বিদ্যমান যৌগগুলি চোখের সাধারণ রোগ থেকে রক্ষা করে। ইঁদুরের উপর করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, আঙুর খাওয়ানো ইঁদুরগুলোর মধ্যে চোখের রেটিনার ভালো কার্যক্ষমতা লক্ষ্য করা যায়।

উপরন্তু, একটি টেস্ট-টিউব গবেষণায়, রেসভেরাট্রল মানুষের চোখের রেটিনা কোষকে অতিবেগুনী A (UVA) আলো থেকে রক্ষা করতে পারে। এটি আপনার বয়স-সম্পর্কিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন এর ঝুঁকি কমাতে পারে। মোটকথা, আঙ্গুরে বেশ কিছু যৌগ রয়েছে : যেমন রেসভেরাট্রল, লুটেইন এবং জেক্সানথিন  যা চোখের সাধারণ রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।

৭. স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে

আঙ্গুরে এমন যৌগ রয়েছে যা স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং মেজাজ উন্নত করতে পারে এবং সেইসাথে আল্জ্হেইমার রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। আঙুর খেলে স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। 

১১১ সুস্থ বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১২ সপ্তাহের একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন ২৫০ মিলিগ্রাম আঙ্গুর বা এর পরিপূরক গ্রহণ করার ফলে গবেষনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তীব্র মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি দেখা যায়।

আরোও ইঁদুরের উপর করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৪ সপ্তাহ ধরে রেসভেরাট্রল গ্রহণের ফলে ইদুরের স্মৃতিশক্তি এবং মেজাজ দুটোই বেশ উন্নত হয়। এছাড়াও, ইঁদুরের মস্তিষ্কে বিকাশ এবং উন্নত রক্ত ​​প্রবাহ লক্ষণ দেখা গেছে। 

৮. হাড় গঠনে সহায়তা করে  

আঙুরে বিভিন্ন ধরেনর খনিজ রয়েছে – পটাসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি, সি এবং কে সহ ইত্যাদি। তাই হাড় গঠনে আঙুর ফলের উপকারিতা কতটা তা সহজেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। নিয়মিত আঙুর খেলে অস্টিওপরোসিস সহ হাড়ক্ষয়জনিত নানা রোগ থেকে সহজেই মু্ক্তি পাওয়া যায়।

পোস্টমেনোপজাল মহিলাদের মধ্যে ২ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৭৫ মিলিগ্রাম রেসভেরাট্রল দৈনিক দুবার গ্রহণ করলে হাড়ের খনিজ পদার্থের  ঘনত্ব বাড়ে এবং হাড়ের ক্ষয় কমে যায়, এমনকি বড় ফ্র্যাকচার এবং হিপ ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি হ্রাস করে।

৯. বার্ধক্যের লক্ষণ ধীর করে এবং দীর্ঘায়ু বৃদ্ধি করে

আঙ্গুরে এমন কিছু যৌগ পাওয়া গেছে যা বার্ধক্য এবং জীবনকালকে প্রভাবিত করতে পারে।

গবেষণা দেখায় যে, রেসভেরাট্রল বার্ধক্যের লক্ষণগুলিকে বিলম্বিত করতে পারে, যেমন অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করা, স্ট্রেস প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রদাহজনক প্রতিক্রিয়া উন্নত করা। তাই নিজের তারুণ্য বজায় রাখতে আজ থেকেই খাদ্যতালিকায় আঙুর যুক্ত করুন।

১০. ব্যাথা প্রশমিত করে 

আঙুরে অ্যান্থোসায়ানিন এবং রেসভেরাট্রল নামক শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা প্রদাহ-বিরোধী আচরণ করে। তাই যেকোন ব্যাথা উপশম করতে আঙুর ফলের উপকারিতা অকল্পনীয়। তাই দেরি না করে আজ থেকেই আঙুর ফল খেতে শুরু করুন।

১১. ত্বক এবং চুলের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে 

রেসভেরাট্রল আপনার ত্বক এবং চুলের উপর অনেক প্রতিরক্ষামূলক প্রভাব ফেলে। এটি ত্বকের ভেতর ক্ষতিকর ইউভি রশ্মি প্রবেশে বাধা ভেদ করে এবং কোলাজেনের ঘনত্ব বাড়ায়। আবার এটি চুল পড়ার হার কমায়। মূলত আঙ্গুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রেসভেরাট্রল আপনার ত্বককে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে এবং চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

১২. স্থূলতা হ্রাস করে

স্থূলতা আপনার ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ক্যান্সার সহ একাধিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। স্থূলতা হ্রাসের জন্য আমাদের প্রচেষ্টারও কমতি নেই। উল্লেখযোগ্যভাবে, আঙ্গুরে বিদ্যমান অ্যান্থোসায়ানিন এর স্থূলতা-বিরোধী প্রভাব থাকতে পারে।

উচ্চ চর্বিযুক্ত ইঁদুরের উপর এক গবেষণায় দেখা যায় যে, অ্যান্থোসায়ানিন শরীরের ওজন বৃদ্ধি দমন করতে পারে এবং লিভারের চর্বি কমাতে অনেকটাই সফল

আঙ্গুরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষুধা নিবারণ করে এবং ওজন বৃদ্ধি রোধ করে স্থূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে।

১৩. কোষ্ঠকাঠিন্য উপশম করে

কোষ্ঠকাঠিন্য কতটা কষ্টকর তা শুধুমাত্র যারা ভুক্তভোগী তারাই জানে! খাদ্যতালিকায় ফাইবার ও কম পানি পান করার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে। আঙ্গুর ফাইবারে ভরপুর একটি ফল, যা আপনার মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।

ফলে বলা যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য এর লক্ষণ উপশম করতে আঙুর অনেকটাই কার্যকর। আঙ্গুরে ৮১% জল রয়েছে, তাই তারা আপনাকে হাইড্রেটেড রাখতে বেশ ভূমিকা রাখে।

১৪. নিদ্রাহীনতা দূর করে

নিদ্রাহীনতা বর্তমান প্রজন্মের জীবণধারায় যেন একটি স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু তারা জানে না এই নিদ্রাহীনতা কত রোগ ডেকে আনতে পারে! যাইহোক এই নিদ্রাহীনতার এক মহাঔষধ হিসেবে কাজ করে আঙ্গুর। আঙুর হল মেলাটোনিনের একটি প্রাকৃতিক উৎস। 

মূলত মেলাটোনিন হচ্ছে ঘুমের প্ররোচনাকারী হরমোন যা আপনার ঘুমানো ও জেগে থাকার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। মজার ব্যাপার হল, মেলাটোনিন প্রধানত আঙ্গুরের ত্বকে পাওয়া যায়, যে কারণে আঙ্গুরের রস থেকে ওয়াইনের মতো পণ্যগুলি উৎপাদন করা হয়।

১৫. ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি এবং রেটিনোপ্যাথি থেকে রক্ষা করে 

কিছু গবেষনা ইঙ্গিত করেছে যে, রেসভেরাট্রল ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি থেকে রক্ষা করতে পারে, যা স্নায়ুর কার্যকারিতাকে অক্ষুন্ন রাখে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, এটি এই যৌগের নিউরোপ্রোটেক্টিভ প্রভাবের কারণে হতে পারে।

এছাড়াও প্রাণীর গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, রেসভেরাট্রল রেটিনোপ্যাথির রোগব্যাধি থেকে চোখকে রক্ষা করে। ডায়াবেটিস সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না রাখলে  ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি এবং রেটিনোপ্যাথির জটিল রোগ হতে পারে।

আঙুর ফলের অপকারিতা 

মুদ্রায় যেমন এপিঠ ওপিঠ থাকে, তেমনি সব কিছুরই একটা ভালো দিক এবং একটা খারাপ দিক রয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন তবে কি আঙুরেরও অপকারিতা আছে! হ্যা অবশ্যই। চলুন অনেক তো আঙুর ফলের উপকারিতা সম্পর্কে জানলেন, এবার এর কিছু অপকারী দিক সম্পর্কেও জেনে নিন।

১. পেট খারাপ হতে পারে

আঙ্গুরে বেশ ভালো পরিমাণেই স্যালিসিলিক অ্যাসিড থাকে। কিছু গবেষণা দাবি করে যে, এই অ্যাসিড নানা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা সৃষ্টি করতে সক্ষম। প্রদাহ, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া এমনকি ফোলাভাবও দেখা দিতে পারে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গবেষনায় অংশগ্রহণকারী যারা আঙ্গুরের বীজ খেয়েছিল, তারা অ্যাপেন্ডিসাইটিস অনুভব করেছিলো। মূলত হজম না হওয়া বীজ বা ফলের অবশিষ্টাংশও তীব্র পেট ব্যথার কারণ হতে পারে। আপনার যদি ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম থাকে তবে আঙ্গুর আরো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। 

২. ডায়রিয়া হতে পারে

গবেষণা দেখায় যে চিনির অ্যালকোহল, চিনিতে পাওয়া জৈব যৌগগুলি ডায়রিয়া সৃষ্টির জন্য অনেকটা দায়ী। তবে, আঙ্গুরে চিনির অ্যালকোহল আছে কিনা তা প্রমাণ করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে আঙ্গুরের রস সংবেদনশীল ব্যক্তিদের মধ্যে ডায়রিয়া সৃষ্টির কারণ এতে সাধারণ শর্করা রয়েছে।

অনেক সময় সঠিক স্যানিটেশনের অভাবেও ডায়েরিয়া হতে পারে।

৩. ওজন বৃদ্ধি পায়

আকারে ছোট হওয়ায় এক নিমিষেই অনেক আঙুর এক বসায় খেয়ে ফেলা যায়। সাইজে ছোট হলেও এক কাপ আঙুর থেকে মোট ১০৪ কিলোক্যালরি পাওয়া যায়। এছাড়াও কিশমিশ, আঙুরের তৈরি নানা মুখরোচক খাবার যেমন : জ্যাম, জেলি, জুস আপনার ওজন বৃদ্ধির জন্য অনেকটাই দায়ী। আর যাই হোক দিনে অন্তত ৮ থেকে ১০ টা আঙুরের বেশি গ্রহণ করবেন না।

৪. গর্ভাবস্থায় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে

মূলত এই অপকারী দিকটির জন্য আঙ্গুরে বিদ্যমান রেসভেরাট্রলকে দায়ী করা যেতে পারে। এটি একটি শক্তিশালী পলিফেনল যা রেড ওয়াইনেও পাওয়া যায়। গবেষণায় বলে, রেসভেরাট্রল বা এর সম্পূরকগুলি বিকাশমান ভ্রূণের অগ্ন্যাশয়ে সমস্যা সৃষ্টি করে। তাই গর্ভবতী মায়েদের অবশ্যই এদিকে বিশেষ নজর রাখা উচিত।

৫. বাচ্চাদের শ্বাসরোধ হওয়ার প্রবণতা 

আঙুরের কারণে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা! ব্যাপারটা অবাক করা হলেও বাস্তব। বিশেষ করে ৬ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুরা ঠিকমতো চিবাতে পারে না। এসময় যদি একটি সম্পূর্ণ আঙুর তার মুখে প্রবেশ করানো হয়, তবে শিশুটির শ্বাসনালী আটকে দম বন্ধ হয়ে যাবে। যত দ্রুত সময় শিশুটির মুখে হাত দিয়ে তা বের করে আনার চেষ্টা করুন। অন্যথায় ডাক্তারের সাহায্য নিন।

৬. অ্যালার্জি হতে পারে

আঙ্গুরের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় আঙ্গুরের লিপিড ট্রান্সফার প্রোটিন। প্রকৃতপক্ষে এটি আপনার মধ্যে গুরুতর অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম। এটি অ্যানাফিল্যাক্সিসের কারণ হতে পারে, যার জন্য জীবন হুমকিরস্বরূপও হতে পারে। যদি আপনার ইতোমধ্যে এলার্জির সমস্যা থাকে, তবে আঙুর আপনার জন্য কতটা নিরাপদ তা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিবেন।

৭. কিডনির সমস্যা সৃষ্টি করে

এক গবেষণায় দেখা যায়, আঙ্গুর খাওয়ার পর কুকুরের তীব্র কিডনি সমস্যা দেখা দিয়েছে। এমনকি বমিও হয়েছিল। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস-এর একটি প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, দীর্ঘদিনের কিডনি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা সীমিত পরিমাণে আঙ্গুর গ্রহণ করবেন।

যদিও কোনো গবেষণায় মানুষের কিডনির প্রতিকূল প্রভাবের সাথে সরাসরি আঙ্গুরের যোগসূত্র খুঁজে পায় নি। তবে আপনাকে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আপনার যদি কোনো ধরনের কিডনি রোগ থাকে, অনুগ্রহ করে আঙ্গুর থেকে দূরে থাকুন এবং আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

যাইহোক, অতিরিক্ত আঙ্গুর গ্রহণের ফলে নানা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পেট খারাপ, ডায়রিয়া, ওজন বৃদ্ধি, গর্ভাবস্থায় জটিলতা, বাচ্চাদের দম বন্ধ হওয়া এবং অ্যালার্জি। এমনকি কিডনির সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং কিছু ওষুধের সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। যদিও আঙুর আপনার ডায়েটে একটি স্বাস্থ্যকর সংযোজন তারপরও যেকোন প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া এড়াতে আঙুরের পরিমিত গ্রহণ নিশ্চিত করুন।

আঙুর ফলের উপকারিতার পাশাপাশি অপকারিতাও বেশ ভালোভাবেই লক্ষণীয়। তবুও এর উপকারী দিকগুলো কোনো অংশেই অবহেলা করার মতো না। পুষ্টি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ এই ফল আপনাকে ক্যান্সার সহ নানা রোগের প্রকোপ থেকে রক্ষা করবে। আপনি যদি আঙুর প্রেমী না হয়ে থাকেন, তবে আগামী ১৪ দিন নিয়মিত আঙুর গ্রহণ করুন। এবং এর প্রভাব আপনার শরীরে লক্ষ্য করুন আমি নিশ্চিত আপনিও আঙুর ফলের উপকারিতা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করবেন না।

আঙুর ও ঔষধের মিথস্ক্রিয়া 

আঙুর ফলের উপকারিতা থাকলেও কীটনাশকযুক্ত আঙুর জীবণের জন্য হুমকিস্বরূপ। সম্প্রতি আঙুরে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। তাই আঙুর কেনার সময় অবশ্যই সর্তক থাকুন। অন্যথায় এই আঙুর আপনার জীবণহানির কারণও হতে পারে। আঙুর কিছু ঔষধের সাথে বিক্রিয়া করেও জীবণনাশকারী হতে পারে। আপনি ভাবতে পারেন, তা আবার কীভাবে সম্ভব! আসলেই সম্ভব। এতে এমন কিছু জৈব উপাদান রয়েছে তা আপনার ঔষধের সাথে বিক্রিয়া করে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। 

বিটা ব্লকার হৃদরোগের অন্যতম জনপ্রিয় ঔষধ। এই ঔষধ আপনার রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়ায়। এখন যদি আপনি আঙুর খান, তাহলে এই পটাশিয়ামের মাত্রা দ্বিগুণ হারে বেড়ে যাবে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ থাকে যে, বিটা ব্লকার ঔষধ সেবনকারী কম মাত্রায় পটাশিয়াম রয়েছে এমন খাবার গ্রহণ করবেন।
আবার অনেকে রক্তের ঘনত্ব কমানোর জন্য ওয়ারফারিন বা কৌমাডিন ওষুধ ব্যবহার করেন। তাদের আঙ্গুর খাওয়ার আগে নিজ নিজ ডাক্তারের সাথে কথা বলা উচিত। কারণ রেসভেরাট্রল ও ভিটামিন কে এই ওষুধের অ্যান্টিকোয়্যাগুল্যান্ট অ্যাকশন বাড়িয়ে দিতে পারে। 

যাদের কিডনি সম্পূর্ণরূপে কাজ করে না তাদের জন্য অত্যধিক পটাসিয়াম গ্রহণ করা বেশ ক্ষতিকারক। যদি কিডনি রক্ত ​​থেকে অতিরিক্ত পটাসিয়াম অপসারণ করতে না পারে তবে এটি মারাত্মক হতে পারে। এই অবস্থায় পটাসিয়ামে সমৃদ্ধ আঙুর গ্রহণ করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, তাই না! তাই আপনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে আঙুর গ্রহণ করবেন।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য

Author

You cannot copy content of this page