পাথরকুচি পাতা খাওয়ার নিয়ম, পাথরকুচি পাতার উপকারিতা অপকারিতা

পাথরকুচি পাতা

Last Updated on 7th April 2024 by Mijanur Rahman

সৌন্দর্য বর্ধনের একটি অন্যতম অংশ হিসেবে আমরা পাথরকুচি গাছকে প্রায় সবাইই চিনি। পাথরকুচি একটি ঔষধি গাছ, এটি বীরুৎজাতীয় একটি উদ্ভিদ। পাথরকুচির বোটানিক্যাল নাম Kalanchoe pinnata (Lamk.) Pers এবং এর ফ্যামিলি Crassulaceae। কবিরাজরা পাথরকুচির এই জাতটিকে আসল পাথরকুচি বলে থাকে। পাথরকুচির পাতাকে বৈজ্ঞানিক জগতে ‘ব্রায়োফাইল’ নামে ও ডাকা হয়। পাথরকুচি অনেক ঔষধি গুণ সম্পন্ন হওয়ায় একে “মিরাকল লিফ” ও বলা হয়ে থাকে।

আরেক প্রজাতির পাথরকুচি রয়েছে, একে ইউনানি সম্প্রদায় আসল পাথরকুচি বলে। এর  বোটানিক্যাল নাম Bergenia ligulata Wall, এর ফ্যামিলি Saxifragaceae। এই প্রজাতির পাতা গুলো অনেকটা গোল হয়।

বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস

জগৎ: Plantae

(শ্রেণীবিহীন): Angiosperms

(শ্রেণীবিহীন): Eudicots

(শ্রেণীবিহীন): Core eudicots

বর্গ: Saxifragales

পরিবার: Crassulaceae

গণ: Bryophyllum

প্রজাতি: B. pinnatum

দ্বিপদী নাম : Bryophyllum pinnatum

(Lam.) oken

বাহ্যিক বর্ণনা

  • স্থানীয় নামঃ পাথরকুচি
  • উদ্ভিদের ধরণঃ বহু বর্ষজীবী সবুজ পাতা বিশিষ্ট।এই গাছের উচ্চতা দেড় থেকে দুই ফুট পর্যন্ত হয়।পাথরকুচির মুল কান্ডের সম্মুখভাগে গুচ্ছবদ্ধভাবে নিম্নামুখি ফুল হয়।ফুলগুলোর ভিতরে ফাঁপা। ফুলগুলো  লম্বায় সাধারণত এক থেকে দেড় ইঞ্চি হয়ে থাকে।ফুলের বাহিরের দিকে সবুজ, লাল ও সাদা দাগ থাকে।  এই গাছে শীতকালে ফুল হয় এবং  গ্রীষ্মকালে ফল হয়।
পাথর কুচি
পাথর কুচি
  • ভেজষ নামঃ Kalanchoe pinnata Pers Crassulaceae
  • পাথরকুচির অন্যান্য নামঃ পাথান বেইদ, পাষাণ ভেদ, Pathorkuchi, American Life plant (ইংরেজি নাম), টি কফপাতা, পটিয়াপুরী
  • পাথরকুচির ব্যবহার যোগ্য অংশ কি?: পাতা
  • পাতাঃ কিছুটা ডিমের মত আকৃতি। পাতা মাংসল  এবং মসৃণ। পাতার চারপাশে ছোট ছোট গোল খাঁজ রয়েছে। পাতার খাঁজ থেকে নতুন চারার জন্ম হয়। পাতা মাটিতে ফেলে রাখলে তা থেকে চারা পাওয়া যায়। এই গাছের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে- পাতা থেকেই এর গাছ জন্মে।
  • কোন কোন স্থানে পাথরকুচি পাওয়া যায়?: চট্রগ্রাম এবং পার্বত্য চট্রগ্রামের নিচু ও আর্দ্র অঞ্চলে পাথারকুচি বেশি দেখা যায়।
  • বিস্তৃতিঃ বাংলাদেশের সর্বত্রই পাথরকুচির বিস্তৃতি রয়েছে।
  • পাথরকুচির চারা রোপনের সময়ঃ বছরের যে কোনো সময়েই এই গাছ রোপন করা যায়।
  • পাথরকুচি জন্মানোর উপযুক্ত মাটিঃ প্রায় সব ধরনের মাটিতে পাথরকুচি গাছ জন্মে। কাঁকর মাটিতে ও সহজে জন্মায় কিন্তু ভেজা এবং স্যাঁতসেঁতে জায়গায় দ্রুত বাড়ে।
  • পাথরকুচির ধরনঃ আবাদী, অনাবাদী, বনজ সব ধরনের পাথারকুচিই হয়ে থাকে।
  • পাথরকুচির বংশবিস্তারঃ পাথরকুচির বংশবিস্তার অথবা নতুন চারা উৎপাদন প্রক্রিয়া খুবই সহজ। পাতার মাধ্যমেই এই গাছের বংশবিস্তার হয়।একটি পরিপক্ক পাতা ছিড়ে রসযুক্ত  মাটিতে রেখে দিলে কয়েকদিন পর পাতার কিনারা থেকে নতুন চারা গজানো শুরু করে।এই গাছের  বিশেষ যত্নের প্রয়োজন ও হয়  না।

পাথরকুচি পাতার উপকারিতা

চলুন জেনে নেয়া যাক, পাথর কুচি পাতার উপকারিতা :

কিডনির পাথর অপসারণ

পাথরকুচি পাতা কিডনির পাথর অপসারণ করতে সাহায্য করতে পারে। পাথরকুচির রস ও খেতে পারেন অথবা দুই একটি পাতাও চিবিয়ে খেতে পারেন।

পেট ফাঁপার সমস্যা কমায়

অনেক সময় পেট ফুলে যায়, প্রসাব আটকে থাকার কারণে। পানির সাথে মিশিয়ে পাথরকুচির রস খেলে এই সমস্যার সমাধান হয়। এছাড়াও চাইলে একটু চিনির সঙ্গে এক বা দুই চা চামচ পাথর কুচি পাতার রস গরম করেও খাওয়া যায়।

মৃগী রোগের তৎক্ষনাত সমাধান

মৃগী রোগাক্রান্ত সময়ে পাথর কুচির পাতার রস কয়েক ফোঁটা করে মুখে দিলে মৃগী রোগের উপশম ঘটে।

শিশুদের পেট ব্যথায়

অনেক সময় শিশুরা পেট ব্যথায় ভুগে। ৩০-৬০ ফোঁটা পাথর কুচির পাতার রস শিশুর পেটে মালিশ করলে ব্যথা কমে যাবে।

পাইলস রোগের চিকিৎসায়

পাথরকুচি পাতার রস এবং গোল মরিচ একসাথে মিশিয়ে পান করলে পাইলস ও অর্শ্ব রোগের উপশম হয়

লিভারের সমস্যা দূর করে

পাথরকুচির পাতার রস লিভারের যেকোনো ধরনের সমস্যা থেকে রক্ষা করে। লিভারকে সুস্থ সবল রাখে।

শরীরের জ্বালাপোড়া কমায়

২ চামচ পাথর কুচি পাতার রস আধা কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে খেলে জ্বালাপোড়া উপশম হয়। এই মিশ্রণটি সকাল বিকাল দুইবেলা করে নিয়মিত খেতে হবে।

মেহ দূর হয়

সর্দিজনিত কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোঁড়া দেখা হতে পারে। এই ফোড়ার কারণে যে ব্যথা হয়, তাকে মেহ বলে।মেহ দূর করতে পাথরকুচি পাতার রস দিনে দুইবেলা এক চামচ করে টানা এক সপ্তাহ খেতে হবে।

পুরোনে সর্দি সারায়

পাথরকুচি পাতার রস বের করে তা একটু গরম করতে হবে,গরম পাথরকুচি পাতার রসের সাথে একটু সোহাগার খৈ মেশাতে হবে। দিনে দুইবেলা ২ চা চামচ করে খেতে হবে।এতে করে পুরোনো সর্দি ও কাশি সেরে যাবে।

পাথরকুচি পাতার উপকারিতা
পাথরকুচি পাতা – www.gettyimages.com

কাটা ছেড়ার স্থানে

পাথরকুচির টাটকা পাতা হালকা আচে গরম করে কাটা অথবা থেঁতলে যাওয়া স্থানে সেঁক দিলে ব্যথা উপশম হবে।

পিত্তথলির রোগের ক্ষেত্রে

পিত্তজনিত কোনো ব্যথায় রক্তক্ষরণ হলে পাথ্রকুচির রস খাওয়া উচিত। পরপর দুইদিন দুইবেলা করে পাথরকুচি পাতার রস খেতে হবে।

পেটের অসুখ সারায়

পাথর কুচি পাতার উপকারিতা হলো কলেরা, ডায়রিয়া বা রক্ত আমাশয়জনিত রোগ সারাতে এই পাতার বিশেষ অবদান রয়েছে। ৩ মিলি পাথর কুচি পাতার রস, ৩ গ্রাম জিরা এবং ৬ গ্রাম ঘি মিশিয়ে মিশ্রণটি কয়েক দিন খেলে পেটের বিভিন্ন অসুখ থেকে মুক্তি মিলবে। পাথর কুচি ডায়রিয়ার সময় রক্ত ​​আসা বন্ধ করে।

ত্বকের যত্নে

পাথরকুচির পাতায় প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে, যা ত্বকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাথরকুচির পাতা বেটে ত্বকে লাগালে ব্রণের সমস্যা দূর হবে। যাদের সংবেদনশীল ত্বক তাদের ক্ষেত্রেও পাথরকুচির পেস্ট উপকারী।

গলগন্ড রোগে

গলগন্ড রোগে আক্রান্ত হলে প্রতিদিন দুইবেলা করে পাথরকুচির পাতার রস সেবন করুন।

খোঁস – পাচড়া, ফোড়া প্রতিরোধে

পাথরকুচির রস, পেস্ট চামড়ার বিভিন্ন সমস্যা যেমন – খোস পাচড়া, ফোড়াসহ আরো প্রহাদ থেকে রেহাই দেয়।

মূত্রনালীর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে

অনেক সময় নারীদের যোনিপথে স্রাবের কারণে অনেক কষ্ট হয়। পাথরকুচি পাতা এই সমস্যা সমাধানে বিশেষ ভূমিকা পালন করে, পাথরকুচি পাতার পেস্টের সাথে মধু মিশিয়ে মিশ্রণটি দিনে দুইবার গ্রহণ করুন। এই মিশ্রণটি ব্যবহারে পুরুষের মূত্রনালীর সমস্যা, প্রসাবে জ্বালাপোড়া, প্রদাহ ও দূর হয়।


পাথরকুচি গাছের উপকারিতা

মাথা ব্যাথা দূর করে

পাথরকুচি পাতার পেস্ট কিছুক্ষন কপালে লাগিয়ে রাখুন। এতে করে মাথাব্যথা কমবে। যাদের ঘন ঘন মাথাব্যথা হয় পাথরকুচির পেস্ট তাদের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

পাথরকুচি পাতা চোখের জন্য উপকারী

পাথরকুচি পাতার রস চোখের চারপাশে লাগান। এই রস চোখের সাদা অংশের ব্যথা নিরাময় করে চোখে আরাম প্রদান করবে।

পাথরকুচি পাতার অপকারিতা

উপকারিতার পাশাপাশি পাথরকুচির কিছু অপকারিতা রয়েছে –

১) অতিরিক্ত পাথরকুচি পাতার রস খাওয়ার ফলে মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

২) পাথরকুচির রস মাত্রারিক্ত সেবনের ফলে পেটের নানান সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন – কলেরা, ডায়রিয়া।

৩) পিত্তথলিতে সমস্যা হতে পারে।

৪) ক্ষুধামন্দা সৃষ্টি হতে পারে।

পাথরকুচি পাতা খাওয়ার নিয়ম

১) পাথরকুচির পাতা বেটে পেস্ট করে খেতে পারে। এতে করে শরীরের জালাপোড়া অনেকাংশে কমে আসবে।

২) পাথরকুচি পাতা বেটে এর রস খেতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী পাতার রসের সাথে গোলমরিচ, মধুসহ অন্যান্য উপাদান মেশাতে পারেন। কিডনির সমস্যা সমাধানের জন্য পাথরকুচির রস খাওয়া শরীরের জন্য ভালো।

৩) সরাসরি পাথরকুচির পাতা চিবিয়েও খেতে পারেন।

ঔষধি গাছের মধ্যে পাথরকুচি গাছ অন্যতম। এই গাছের বহু ঔষধি গূনাগুন রয়েছে। পেস্ট, রস এমনকি শুধু পাতা চিবিয়েও খাওয়া যায়। আশা করি আজকের এই আলোচনায় পাথরকুচির বহুল উপকারিতা ও ব্যবহারের নিয়ম আপনাদের উপকারে আসবে।

পরিশেষে

আশা করি উপরোক্ত আলোচনা থেকে আপনাদের পাথরকুচি পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে ভালো একটা ধারণা হয়েছে, তারপরো পাথরকুচি পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে যদি কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।

আমি যত তারাতারি সম্ভব উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো।

Author

Scroll to Top