ফরমালিন কি? ফরমালিনের উপকারিতা ও অপকারিতা, কাজ ও ব্যবহার ২০২২

ফরমালিন

পানিতে ফরমালডিহাইডের ৩৭-৪০% পরিমান দ্রবণকে ফরমালিন বলা হয়। এটি জীবাণুনাশক এবং সংরক্ষণকারী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি শক্তিশালী গন্ধযুক্ত, বর্ণহীন গ্যাস। ফরমালিনের ফর্মুলা  হলোঃ- CH2O। ফরমালিনকে খোলা অবস্থায় রেখে দিলে এটি খুব দ্রুত বাতাসে মিশে যায়  সাধারণত কয়েক ঘন্টার মধ্যে। এটি সহজেই পানিতে দ্রবীভূত হয় কিন্তু খুব বেশিক্ষণ স্থায়ি হয় না।

ফরমালিনের ইতিহাস

সর্বপ্রথম ফরমালিন আবিষ্স্কা্র করা হয় ১৮৫৯ সালে। আলেকজান্ডার মিখাইলোভিচ বাটলারভ তিনিই প্রথম ফরমালিন আবিষ্স্কা্র করেছিলেন।  ১৮৬৮ সালে এ.ডাব্লিউ ফম্যান  এর ফর্মুলার মাধ্যমে এটি সবচেয়ে বেশি উত্পাদিত হচ্ছে। হফম্যান একটি উত্তপ্ত প্লাটিনাম উপর মিথেনল এবং বায়ুর মিশ্রণ দিয়ে একটি ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেছিলেন। ১৮৮২ সালে বিজ্ঞানি কেকুল এটিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তখন তিনি বিশুদ্ধ  ফরমালিন তৈরির একটি বর্ণনা দেন। তখন ফর্মালডিহাইড গবেষণায় দুটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ করা গেছে। পরবরতিতে বিজ্ঞানি টবি লেনস মিথেনল বাষ্প নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।  এটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় জার্মানিতে ১৮৮০ -এর দশকে, এবং ১৯০০ -এর দশকের গোড়ার দিকে বেলজিয়াম, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করেছিল। ওই সময় ফরমালিন প্রধানত একটি এমবালিং এজেন্ট বা মেডিকেল প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হত।

ফরমালিনের উপকারিতা ও ব্যবহার

ফরমালিন একটি অপরিহার্য রাসায়নিক যা দৈনন্দিন জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে এটি শুধু প্রিজারবেটিভ এবং জীবানুনাশক হিসেবে হিসেবে ব্যবহার করা হয় আসলে ব্যাপারটি ঠিক এমন নয়। এটি ব্যাপকহারে ব্যবহার করা হয়। এটি ব্যাপকভাবে রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে ব্যবহৃত হয়। রাসায়নিক শিল্পে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বেশ কয়েকটি রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলির জন্য একটি সস্তা  উপাদান। এটি শিল্প ক্ষেত্রে প্লাইউড, চিপবোর্ড, পেইন্ট এবং প্লাস্টিকের সামগ্রী, টেক্সটাইল শিল্প, কার্পেট, আসবাবপত্র এবং গৃহস্থালি পরিষ্কারের পণ্য  নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। আমরা জানি যে ফর্মালডিহাইড যখন পানিতে দ্রবীভূত হয় তখন এটিকে ফরমালিন বলা হয়, যা সাধারণত জীবাণুনাশক হিসাবে ব্যবহৃত হয়, এবং মেডিকেল ল্যাবগুলিতে সংরক্ষণকারী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এটি কিছু খাবার এবং পণ্য, যেমন এন্টিসেপটিক্স, এবং প্রসাধনীতে সংরক্ষণকারী হিসাবে ব্যবহার করা হয়। তবে কখনও কখনও, প্রসাধনী, সাবান, শ্যাম্পু, লোশন এবং সানস্ক্রিন এবং পরিষ্কারের পণ্যগুলিতে এটির ব্যবহার পাওয়া গেছে।

ফরমালিন
ফরমালিন যেভাবে বাজারে পাওয়া যায়

ফরমালিন জৈবিক নমুনা এবং মমি সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয় কারণ এটি প্রোটিনকে শক্ত করে এবং তাদের পচন থেকে বাধা দেয়। এছাড়াও, এটি জীবাণুনাশক হিসাবে ব্যবহৃত হয় কারণ এটি পোকামাকড় এবং অনেক অণুজীবকে হত্যা করে।।  এটি ঔষধের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। এটি অ্যানাটমি ল্যাবরেটরিতে ক্যাডাভার নির্ণয়ের জন্য এবং পচন ছাড়াই এর দীর্ঘমেয়াদী স্টোরেজ ব্যবহার করা হয়। এবং টিস্যু স্থিরকরণের সময় হিস্টোলজি এবং প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি দন্ত চিকিৎসায়, ক্লিনিকে সিস্টাইটিসের চিকিৎসার জন্য এবং কিছু ওষুধের সংরক্ষণকারী হিসাবে এটি ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও, হেমোডায়ালাইসিস ইউনিটে ব্যবহৃত দ্রবণে এটি থাকে।

চিকিৎসা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ফর্মালডিহাইডের ব্যবহার যেমন-সিন্থেটিক রেজিন এবং রাসায়নিক যৌগ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় যার মোট উৎপাদন ১.৫%। নিম্নে কিছু ফরমালিন এর ব্যবহার বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ

জীবাণুনাশক হিসেবে

  •  ফরমালিন একটি অত্যন্ত কার্যকর জীবাণুনাশক। এটি ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে।
  •  ফরমালিন জলীয় দ্রবণ ব্যাকটেরিয়াকে হত্যা করতে পারে এবং এটি ত্বকের সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
  • এটি নির্দিষ্ট সংক্রমণের জন্য ইনোকুলেশন তৈরির জন্য বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়াল পণ্যগুলিকে নিষ্ক্রিয় করতে ব্যবহৃত হয়।
  • এটি মূত্রনালীর সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কিছু মলম ফরমালডিহাইডের ডেরিভেটিভ হিসেবে ব্যবহার করে। যাইহোক, এগুলি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে।
  •  এটি তীব্র গন্ধ যুক্ত যা নাক এবং চোখের তীব্র জ্বালা সৃষ্টি করে। অনেক কোম্পানি সম্প্রতি রাসায়নিকের একটি প্রক্রিয়াকৃত ফর্ম তৈরিতে সফল হয়েছে, যা জ্বালাময়ী নয়, তবুও একটি কার্যকর জীবাণুনাশক।

বস্ত্র শিল্পে

  •   এটি  টেক্সটাইল শিল্পে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে এটিকে রং হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
  • ফরমালিন রং কে  ফ্যাব্রিকের সাথে আরও ভালভাবে আবদ্ধ করতে সহায়তা করে, এইভাবে রঙকে বিবর্ণ হওয়া থেকে বিরত রাখে।
ফরমালিন কি
ফরমালিন কি

অটোমোবাইল শিল্পে

  • অটোমোবাইলের মূল উপাদানগুলি ফরমালডিহাইড ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। যেহেতু ফর্মালডিহাইড আগুন এবং উচ্চ তাপমাত্রার তাপ প্রতিরোধী, ফরমালডিহাইড  যানবাহনকে হালকা এবং আরও শক্তি-সাশ্রয়ী করতে সাহায্য করে।
  •  ফরমালডিহাইড ছাঁচযুক্ত উপাদান এবং আন্ডার-দ্য-হুড উপাদানগুলি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয় যা উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। ফরমালিন, ক্লিয়ার কোট পেইন্ট, টায়ার-কর্ড, ব্রেক প্যাড এবং ফুয়েল সিস্টেমের উপাদান তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।

কোষ এবং টিস্যু সংরক্ষণ

  • হিউম্যান ফর্মালডিহাইড দ্রবণ মানব ও প্রাণীর নমুনা সংরক্ষণের জন্য পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত হয়। 
  • আপনি হয়ত ভাবছেন কিভাবে  ফরমালিন কোষ এবং টিস্যু সংরক্ষণ করে, তাহলে আমি আপনাকে বলছি এটি প্রোটিনের প্রাথমিক অ্যামিনো গ্রুপের প্রোটিন বা ডিএনএ -তে নাইট্রোজেনের পারমাণবিক সংযোগ এবং এটি -CH2 সংযোগের মাধ্যমে কোষ এবং টিস্যু সংরক্ষণ করে। 

ভবন নির্মাণ

  • ফর্মালডিহাইড কাঠের পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় যা  কাউন্টারটপস, ছাঁচনির্মাণ, আসবাবপত্র, তাক, সিঁড়ি ব্যবস্থা, মেঝে, দেয়াল শীথিং, সাপোর্ট বিম এবং ট্রাস এবং অন্যান্য অনেক গৃহসজ্জা এবং কাঠামোতে ব্যবহৃত হয়।
  •  বিল্ডিং ব্লক হিসাবে ফর্মালডিহাইড ব্যবহার করা হয়।

স্বাস্থ্যসেবায়

  •  ফরমালিন টিকা, সংক্রামক-বিরোধী ওষুধ এবং হার্ড-জেল ক্যাপসুল তৈরিতে নিরাপদ ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফর্মালডিহাইড ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে ব্যবহৃত হয় যাতে তারা রোগ সৃষ্টি না করতে পারে। যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন তৈরিতে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস।

ব্যক্তিগত যত্ন এবং বিভিন্ন পণ্য

  •  ব্যক্তিগত যত্ন এবং বিভিন্ন সামগ্রী তৈরিতে ফর্মালডিহাইড-ব্যবহার করা হয় যা অত্যন্ত অপরিহার্য। এই পণ্যগুলিতে ফর্মালডিহাইড-রিলিজিং উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যা বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য রোগজীবাণুর বৃদ্ধি রোধ করার জন্য প্রিজারভেটিভ হিসেবে কাজ করে, পণ্যের শেলফ লাইফ বাড়িয়ে দেয়। যেমন- প্রসাধনী পন্য।

অন্যান্য ব্যবহার

  • উপরে উল্লিখিত  ফরমালিন প্রধান ব্যবহার ছাড়াও, রাসায়নিকের আরও অনেক পরিচিত ব্যবহার রয়েছে। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেগুলি কী!  ফরমালিন এর একটি সাধারণ ব্যবহার হল কালি তৈরি করা। সুতরাং, আমরা আমাদের প্রিন্টারে যে কালি ব্যবহার করি তা যেন  নস্ট না হয়, এর জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।
  • জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম শিল্পে এই জ্বালানীর ফলন উন্নত করতে  এটি ব্যবহৃত হয়।
  •  ফরমালিন ডেরিভেটিভ হেক্সামিন বিস্ফোরক আরডিএক্স তৈরিতে উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়!
  • একটি প্রিজারভেটিভ হিসাবে ফর্মালডিহাইড পেইন্টে ব্যবহার করা হয়। এটি প্রসাধনীতে প্রিজারভেটিভ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
  • ফর্মালডিহাইড পলিসেটাল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যা বৈদ্যুতিক এবং ইলেকট্রনিক অ্যাপ্লিকেশনগুলিতে ব্যবহৃত হয়।

খাবারে ফরমালিন

প্রধানত খাবারকে দীর্ঘদিন স্থায়ি রাখতে আমরা এটি ব্যবহার করে থাকি। যাতে খাবার নস্ট না হয়।খুব কম ধরনের খাদ্যতেই ফরমালিন সংযোজন হিসাবে অনুমোদিত। এর অর্থ আপনি খাবার  দীর্ঘদিন স্থায়ি করার জন্য সব ধরনের খাবারেই এটি ব্যবহার করতে পারবেন না। তাত্ত্বিকভাবে, উচ্চ মাত্রার ফরমালিন ধারণকারী মাছ খাদ্য সরবরাহে গ্রহণ করা উচিত নয়। তবে মাছ ব্যবসায়িরা উচ্চ লাভের আসায় এটির ব্যবহার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ব্যবহার করে যা করা একদমই ঠিক নয়। মাছ ছাড়াও আরো বিভিন্ন ধরনের খাবার আছে যাতে এটি ব্যবহার করা হয়। যেমন- ফল-মুল, শাক সবজি, দুধ, চিনি, কফি ইত্যাদি। নিম্নে আমরা এই ব্যাপারে আরও জানব।

যেসব খাবারে ফরমালিন থাকে

ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি (ইএফএসএ) উল্লেখ করেছে যে খাবারের ফরমালিনের প্রাকৃতিক মাত্রা ওই পণ্যের ধরণের উপর নির্ভর করে। এখানে কিছু সাধারণ উদাহরণ দেয়া হলো মিলিগ্রাম (মিলিগ্রাম) থেকে কিলোগ্রাম (কেজি) খাদ্য পণ্যের তালিকাভুক্ত করা হলো যেমন ৬ মিলিগ্রাম/কেজি মানে ১ কেজি খাবারে ৬ মিলিগ্রাম ফর্মালডিহাইড থাকবেঃ

মাংস এবং হাঁস -মুরগি: ৫.৭  থেকে ২০ মিলিগ্রাম/কেজি

দুধ: ০.০১থেকে ০.৮ মিগ্রা/কেজি

মাছ: ৬.৪ থেকে ২৯৩ মিগ্রা/কেজি

চিনি: ০.৭৫ মিগ্রা/কেজি

উত্পাদন: ৬ থেকে ৩৫ মিলিগ্রাম/কেজি

কফি: ৩.৪ থেকে ১৬  মিগ্রা/কেজি

ফরমালডিহাইড কি বিষাক্ত?

প্রচুর পরিমাণে, ফরমালিন বিষাক্ত হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এটির বিষক্রিয়া বিরল, কিন্তু এটি ঘটতে পারে যদি কোনও ব্যক্তি এই পদার্থের উচ্চ মাত্রার সংস্পর্শে আসে। এটির বিষক্রিয়ার চরম ক্ষেত্র হচ্ছে নিম্ন রক্তচাপ, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, শ্বাস প্রশ্বাস নেয়াতে কষ্ট হওয়া আরো অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন- অস্থিরতা, অজ্ঞানতা, কোমা এবং বিরল ক্ষেত্রে মৃত্যু হতে পারে। কিছু রিপোর্ট ইঙ্গিত দেয় যে ফর্মালডিহাইড দিয়ে পরিষ্কার করা ডায়ালাইসিস মেশিন ব্যবহার করে রোগীরা লোহিত রক্তকণিকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। নিম্নে ২ টি ফরমালিন এর বিষাক্ততার ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ

১)শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা।

২)ফরমালিন যুক্ত খাবার।

শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা

শ্রমিকদের টেক্সটাইলস কারখানায় কাজ করতে হয় যার ফলে তারা ফরমালিন এর সংস্পর্শে আসে এবং তাদের সাস্থের ঝুঁকি দেখা দেয় সেটি হচ্ছে  শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা। আরও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কর্মীদের মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, মেডিকেল ল্যাব টেকনিশিয়ান এবং মর্টারি কর্মী ইত্যাদি। শিক্ষক এবং ছাত্র যারা ফর্মালিনের সাথে সংরক্ষিত জৈবিক নমুনা নিয়ে কাজ করে তাদের সাস্থ্য ঝুঁকি থাকে। এই সকল মানুষদের শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তবে ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে একেক গবেষক একেক ভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান জার্নাল অফ এপিডেমিওলজির একটি গবেষণায় দেখা গেছে যারা রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ে কাজ করে তাদের একটি বড় গোষ্ঠীর সাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তাদের শরীরের কোন স্তরে শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা, নাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার বা মাইলয়েড লিউকেমিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি ছিল নাহ। তবে একদল বিজ্ঞানিরা প্রমান পেয়েছে তাদের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট (এনসিআই) থেকে  যে, মানুষের গবেষণার তথ্য এবং ল্যাব গবেষণার উপর ভিত্তি করে, ফর্মালডিহাইডের সংস্পর্শে মানুষের মধ্যে লিউকেমিয়া, বিশেষত মাইলয়েড লিউকেমিয়ার মতো রোগ হতে পারে।”

আরো পড়ুনঃ সিলেট মাজার সম্পর্কে জানা-অজানা সব তথ্য

ফরমালিন যুক্ত খাবার

ফরমালিন যুক্ত খাবার অতিরিক্ত গ্রহনে আমদের সাস্থ্য ঝুঁকি  দেখা দিতে পারে। এজেন্সি ফর টক্সিক সাবস্ট্যান্স অ্যান্ড ডিজিজ রেজিস্ট্রি এই ইন্সটিটিউটটি ব্যাখ্যা দিয়েছে যে, এটি অতিরিক্ত শরীর এ প্রবেশ করলে আপনার বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। যেমন- আপনার খাদ্য গ্রহনে অনিহা দেখা দিতে পারে, কিডনি এবং লিভার, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ক্ষত এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। যাইহোক, এজেন্সি ফর টক্সিক সাবস্ট্যান্স অ্যান্ড ডিজিজ রেজিস্ট্রি আরও বলেছে যে বিষাক্ত প্রভাবগুলি ৫০-১০০ মিলিগ্রাম পরিমান যদি কারো দেহে দৈনিক প্রবেশ করে তাহলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে বলে ধারণা  করা হয়। ডব্লিউএইচও অনুমান করে যে একজন ব্যক্তির গড় খাবারের মাধ্যমে ফরমালডিহাইডের গড় ভোজনের গড় দৈনিক ১.৫-১৪মিলিগ্রাম। ১৫০ পাউন্ড ব্যক্তির জন্য এই পরিসরের এটি অনেক। এটি হবে প্রায় ২.০ মিলিগ্রাম।

ফরমালিনযুক্ত ফল
ফলে ফরমালিন দেওয়ার পর দেখতে যেমন হয়।

ফরমালিনের অপকারিতা

আমরা ইতি মধ্যেই জেনে এসেছি যে ফরমালিন আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর।তবে আরও কিছু ক্ষতি রয়েছে যা আপনি হয়ত জানেন না সেটি এবার ব্যাখ্যা করব। এটির তীক্ষ্ণ গন্ধ রয়েছে যা অনেক ক্ষতিকর এবং এর বাতাস মানুষের ত্বক,চোখের জ্বালা সৃস্টি করতে পারে। ফর্মালডিহাইড এর সাধারণ প্রভাব হল চোখের শ্লেষ্মা এবং উপরের শ্বাসনালীর জ্বালা পোড়া সৃস্টি করে।ফরমালডিহাইড ১৯৯৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট এর একটি গ্রুপ যার নাম ২এ ​​কার্সিনোজেনিক এজেন্ট। তাদের গবেষণার ফলস্বরূপ, ফর্মালডিহাইড নাক এবং উপরের শ্বাসনালীর ক্যান্সার এবং ত্বকের ক্যান্সারের ঘটাতে পারে বলে জানা গেছে।ওএসএইচএ ৫২ টি পেশা চিহ্নিত করেছে যা মানুষের জন্য ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ পেশা গুলোর মধ্যে যেই গুলো রয়েছে তার একটি তালিকা নিচে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

১) ফরমালিন যুক্ত যৌগের উৎপাদন পর্যায়ে কর্মরত শ্রমিকরা ঝুকিতে রয়েছে।

২) ফরমালিন পণ্য যেমনঃ-আঠালো জাতীয় পন্য, চিপবোর্ড, এমডিএফ, পাতলা পাতলা কাঠ, বার্নিশ, অগ্নি প্রতিরোধক যন্ত্র  ইত্যাদি। এসব কারখানায় কাজ করা শিল্প কর্মীরা সাস্থ্য ঝুকিতে রয়েছে।

৩) ট্রাফিক বা গ্যারেজে শ্রমিকরা ঝুকিতে রয়েছে।

৪) অ্যানাটমি, প্যাথলজি, এবং হিস্টোলজি ল্যাবরেটরি স্টাফ (মেডিসিন এবং ভেটেরিনারি)

৫) যারা ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম এবং অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী জীবাণুমুক্ত করে – দন্তচিকিৎসক এবং নার্স।

৬)  কাগজ, কাগজের পন্য এর কারখানার শ্রমিক।

যেহেতু ফর্মালডিহাইড শরীরের অনেক টিস্যু এবং অঙ্গের উপর ক্ষতিকারক এবং এমনকি বিষাক্ত প্রভাব ফেলে। যেই ঘনত্ব এর কারনে আমাদের সাস্থ্যঝুকি রয়েছে সেই ফর্মালডিহাইডের ঘনত্ব ০.৩ পিপিএম।  এটি আরও অনেক নিচের স্তরে রাখা প্রয়োজন, যা ফরমালডিহাইড-কর্ম পরিবেশে অনুমোদিত সীমা। তাহলেই সাস্থ্যঝুকি কমানো সম্ভব হবে। ম্যাক্রোস্কোপিক অ্যানাটমি ল্যাবরেটরিতে যেখানে ফরমালডিহাইড বেশি ঘন ঘন ব্যবহার করা হয়, সেখানে ফরমালডিহাইডের ক্ষতিকর প্রভাব রোধে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। একটি উপযুক্ত টিস্যু নির্ধারণের জন্য ১০% এর পর্যাপ্ত ঘনত্ব অতিক্রম করা উচিত নয়। শনাক্তকরণের অপেক্ষায় থাকা উপকরণ এমনভাবে বন্ধ করা উচিত যাতে বাতাস না থাকে। ল্যাবরেটরির কর্মীদের অনেক সতর্কতার সাথে কাজ করতে হবে। তাদেরকে পুরোপুরি ট্রেইনিং এর আওতায় আনতে হবে এটির ব্যবহার সম্পর্কে। তারা ট্রেইনিং এ পাশ করলেই পরীক্ষাগারে কাজ করতে দেয়া উচিত। পরীক্ষাগার কর্মীদের যতটা সম্ভব  ফর্মালডিহাইডের ব্যবহার কমিয়ে আনা উচিত।

আরো পড়ুনঃ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) কেন ভর্তি হবেন? জেনে নিন বিস্তারিত।

কর্মীদের বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ঝুঁকিগুলো থেকে বাচতে সুরক্ষা গ্লাভস এবং মাস্ক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। ফরমালডিহাইডের নির্গমন এলাকা নিরাপদ এলাকা চিহ্নিত করে  ম্যাপ করা প্রয়োজন যাতে এটি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের ক্ষতি করতে না পারে। এই সব ক্ষতিকারক প্রভাব সত্ত্বেও, ফর্মালডিহাইড তার সস্তা এবং ভাল সনাক্তকরণের সমাধানের কারণে সারা বিশ্বে এখনও ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে ফরমালিন

যদি কোন গুদামের মালিক সরকার অনুমোদিত লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন মজুদ করেন তাহলে সে এই অপরাধের জন্য শাস্তি পাবে। এই আইনটিতে ৩৭ টি ধারা রয়েছে। এই আইনে উল্লিখিত রয়েছে যে অপরাধগুলি জ্ঞানযোগ্য অর্থাৎঅপরাধী সে সব জেনে শুনে এমন অপরাধে জড়িয়েছে। যদি এমন কাজ কেউ করে থাকে তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে দ্রুত পদক্ষেপের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা ও উপ-জেলায় একটি ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন করা হবে হয়েছে। এটি বেয়াইনি ভাবে উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, হোর্ডিং এর প্রতিটি স্তরে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর যথাযথ ব্যবহারের জন্য সরকার লাইসেন্স এর ব্যবস্থা করে দিয়েছে বর্তমানে।


ফরমালিন কি? ফরমালিনের ব্যবহার। ফরমালিনের ক্ষতিকর দিক

ফরমালিনযুক্ত খাবার

যদি আপনি আপনার খাবারে ফরমালডিহাইডের পরিমাণ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে আপনার জন্য একটি সহজ নির্দেশিকা দেওয়া হলো যেটি মেনে চললে আপনি ফরমালিনের স্বাস্থ্য ঝুকি থেকে র রক্ষা পেতে পারবেন।

  • আপনি ফলমুল বা সবজি এই গুলো বাজার থেকে কিনার পর অবশ্যই পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ফরমালডিহাইড পানিতে দ্রবণীয়, তাই ঠান্ডা চলমান পানির নিচে ফল ও সবজি ধুয়ে মোট পরিমাণ কমাতে সাহায্য করবে। খাদ্য সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ভাল অভ্যাস যা কোনও ময়লা বা ব্যাকটেরিয়া অবশিষ্টাংশ ধুয়ে ফেলতে সাহায্য করে তাই ধুয়ে ফেলুন।
  • মাংস এবং মাছের মত খাবারগুলো তাদের সঠিক তাপমাত্রায় রান্না করুন। এটি ফর্মালডিহাইডের পরিমাণ কমাতে পারে এবং খাদ্যবাহিত অসুস্থতা রোধ করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
  • দেশি মাছ কিনুন। আপনি স্থানীয়ভাবে বা আঞ্চলিকভাবে ধরা পড়া মাছের সন্ধান করুন।  ভোক্তাদের পরামর্শ দেওয়া হয় যে তারা এমন মাছ কেনা থেকে বিরত থাকুন যা কঠোর বা অস্বাভাবিক গন্ধ নির্গত হয় সেই সকল মাছ কিনা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। 

বিঃদ্রঃ  এই ব্লগের প্রত্যেকটা ব্লগ পোস্ট Sylhetism ব্লগের নিজস্ব ডিজিটাল সম্পদ। কেউ ব্লগের কোন পোস্ট কিংবা আংশিক অংশ ব্লগের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কপি পেস্ট করে অন্য কোথাও প্রকাশ করলে ব্লগ কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার অধিকার রাখে। এবং অবশ্যই কপিরাইট ক্লাইম করে যে মাধ্যমে এই ব্লগের পোস্ট প্রকাশ করা হবে সেখানেও কমপ্লেইন করা হবে।

এই ব্লগের কোন লেখায় তথ্যগত কোন ভুল থাকলে আমাদের Contact পেইজে সরাসরি যোগাযোগ করুন, আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তথ্য যাচাই করে লেখা আপডেট করে দিবো।

এই ব্লগের কোন স্বাস্থ বিষয়ক পোস্টের পরামর্শ নিজের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিবেন, আমরা স্বাস্থ বিষয়ে কোন বিশেষজ্ঞ না, আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ হচ্ছে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা। সুতারাং কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার অবশ্যই আমরা নিবো না। ধন্যবাদ, ব্লগ কর্তৃপক্ষ।

Author

Leave a Comment

Your email address will not be published.

You cannot copy content of this page