মানসিক রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা, মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায় ২০২২

মানসিক রোগের লক্ষণ

সারা বিশ্বে মানসিক রোগে ভুগছে ১০০ কোটি মানুষ। অথচ, আমাদের দেশে মানসিক রোগ বিষয়টা নিয়ে তেমন কথাবার্তা হয় না। আমরা বরাবরই মানসিক রোগ নিয়ে উদাসীন। কিন্তু বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শুধু এ ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে অনেকেই দুর্বিষহ জীবন যাপন করে। অথচ সামান্য সচেতনতায় তাদের জীবন ও সুস্থ স্বাভাবিক হতে পারত।

সর্বশেষ ২০১৮-১৯ সালের মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে মানসিক রোগীর সংখ্যা  নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬.8% মানসিক রোগে আক্রান্ত যার ৯২ শতাংশ চিকিৎসা সেবার বাইরে। এর মধ্যে বিষণ্নতার রোগী ৬.৭ শতাংশ এবং উদ্বিগ্নতা রোগে ভুগছেন ৪.৫ শতাংশ। আর ৭-১৭ বছরের প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু মানসিক রোগে ভুগছে। যার নব্বই শতাংশের বেশি শিশুর কোন চিকিৎসা করানো হয় না। বাংলাদেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা হুহু করে  বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা অতিমারির জন্যই এই সংখ্যা যে আর ও বাড়বে তা বলার অবকাশ রাখে না। তা যাইহোক এই আর্টিকেলে আমরা আজকে জানবো মানসিক রোগ কি? মানসিক রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত।

মানসিক রোগ

মানসিক রোগ (Mental  Disorder) বা মানসিক ব্যাধি ও এক প্রকার রোগ। মস্তিষ্কের রোগের কারণে দীর্ঘ দিন ধরে কোনো মানুষের আচার-আচরণ,জীবন-যাপনে অস্বাভাবিকতাই মানসিক রোগ বা মনোরোগ। যা সরাসরি মস্তিষ্কের বিশেষ অঞ্চল বা ফাংশনগুলির সাথে জড়িত। জিনগত বা ব্যক্তিগত জীবনের কোনও কার্য-কলাপে মস্তিষ্ক যখন তার স্বাভাবিক ক্রিয়া ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন মানসিক রোগের উৎপত্তি হয়। যার জন্য তার  স্বাভাবিক পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত জীবন ব্যাহত হয় অথবা রোগী তীব্র মানসিক যন্ত্রণা বা অস্বস্তিতে ভোগে।

রিলেটেডঃ মন খারাপ কেনো হয়? জেনে নিন মন ভালো করার উপায়

মন কী

মানসিক রোগ মানে মনের রোগ। তাই চলুন মন কী তা জেনে নেই। মন বলতে হৃৎপিন্ড বা আত্মা বোঝায় না। ব্রেইন বা মস্তিষ্ককেই মন বলে। মস্তিষ্কের চিন্তা বা অনুধাবন করার প্রক্রিয়াই মন। মন মানুষের চালিকা শক্তি। মানুষের বিবেক, বুদ্ধি ও কাজ-কর্মের কেন্দ্রস্থল। আমাদের আবেগ, চিন্তা, ইচ্ছা, কল্পনার মনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে অক্ষম হয়। তার চলন-বলন-কথন, কর্মস্পৃহা-কর্মোদ্যম সব কিছুতে একটা  অসংগতি থাকে।

মন খারাপ
মন খারাপ

মানসিক রোগের লক্ষণ

  • দৈনন্দিন কাজকর্মে অনীহা। দাঁত মাজা, গোসল করা ইত্যাদি ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছনতায় বিরক্তি বা অলসতাবোধ করা।
  • নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেওয়া।
  • দীর্ঘ সময় ধরে মান খারাপ, কোনও কিছুতে আনন্দ খুঁজে না পাওয়া।
  • রুক্ষ মেজাজ,অল্প কিছুতে রেগে যাওয়া,বদ মেজাজ দেখানো ।
  • মানুষকে অতিরিক্ত বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করা।
  • সবাইকে সন্দেহ করা, এমনকি পরিবারের মানুষদের কেও অবিশ্বাস ও সন্দেহ করা।
  • মানুষকে মেরে ফেলানোর হুমকি  দেওয়া । কাউকে হত্যার চেষ্টা করা। মানসিক রোগে আক্রান্ত মা তার সন্তানকেও মেরে ফেলতে পারে।এমনকি নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
  • একা একা কথা বলা,বির বির করা,হাসা।
  • গায়েবি আওয়াজ শুনতে পারা।
  • সব কিছুতে নিজেকে দায়ী করার প্রবণতা।
  • সারাক্ষণ ভয় পাওয়া।
  • অধিক চঞ্চলতা । উগ্র আচরণ । যেমন-মারপিট করা, ভাংচুর করা। ৩-৫ শতাংশ রোগি এমন আক্রমণাত্নক স্বভাবের হয়ে থাকেন।

মানসিক রোগের কারণ

মানসিক রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া দুরূহ। এর কারণগুলো অধিকাংশ সময় অস্পষ্ট।সাধারণভাবে মানসিক রোগের জন্য তিনটি বিষয়কে দায়ী করা হয়। যথা-

  • জেনেটিক বা বংশগত
  • মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তন
  • সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণ।

মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তন

মানুষের ব্রেইনে কিছু কেমিকেল অনিয়মিত থাকতে পারে যেটা চিন্তা এবং আচরণের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ রোগের গবেষণায় আক্রান্ত মানুষের ব্রেইনে কিছু অস্বাভাবিক গঠন লক্ষ করা গেছে। ব্রেইন ইমাজিং এবং টমোগ্রাফি পরীক্ষা করে রাসায়নিক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর উপর ভিত্তি করেই মানসিক রোগের মেডিসিন প্রয়োগ করা হয়।

সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণ

  • বৈষম্য, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব
  • খারাপ আচরণ, মাদকাসক্তি
  • পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও কলহ,বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ
  • ব্যক্তিগত সম্পর্কচ্ছেদের আঘাত
  • কঠোর শৃঙখলায় শিশু লালন পালন
  • শিশু নির্যাতন (মানসিক, শারীরিক ও যৌন)।

জেনেটিক বা বংশগত কারণ

গর্ভবতী মায়ের মনের উপর চাপ সৃষ্টি হলে বা দুশ্চিন্তায় কাটালে অনাগত সন্তানের জন্মগত রোগ হওয়ার সম্ভবনা থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা মানসিক রোগ হয়। পরিবারের সদস্যদের কারো মানসিক রোগ থাকলে এই  রোগ হতে পারে।

মানসিক রোগের প্রকারভেদ

মানসিক রোগকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা

  • নিউরোটিক
  • সাইকোটিক

সাধারণত সাইকোটিক রোগীরা ডাক্তার দেখান, নিজেরাই ওষুধ খান। কিন্তু সাইকোটিক রোগীরা মনে করেন  তিনি সুস্থ আছেন। কিন্তু আশে পাশের মানুষগুলো তাকে ভুল ভাবছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বোঝানো মুশকিল হয়ে পড়ে।

নিউরোটিক রোগের এর মধ্যে আছে ডিপ্রেশন বা হতাশা বা বিষণ্ণতা , অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগজনিত রোগ, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD)বা শুচিবাই, অনিদ্রা, অস্বাবিক ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি।

সাইকোটিক এর মধ্যে আছে সিজোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার। এগুলো গুরুতর মানসিক রোগ। এসব রোগে মাত্র ১শতাংশ রোগীর হয়।

মানসিক রোগের তালিকা

মানসিক রোগ কয়েক ধরনের হয়ে থাকে, মন খারাপ থেকে শুরু করে অটোফ্যাজিয়া, অনিদ্রা পর্যন্ত মানসিক রোগের আওতায় পরে, তাহলে চলুন দেখে নেওয়া যাক মানসিক রোগ কি কি। মন খারাপ নিয়ে আমাদের ব্লগে আরেকটি আর্টিকেল আছেঃ মন খারাপ কেন হয়? জেনে নিন মন ভালো করার উপায় আগ্রহীরা এই আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে পারেন।

১) বিষন্নতা বা ডিপ্রেশন

বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন অকারণে মনকে ছেয়ে ফেলে এবং লম্বা সময় আপনার মানসিক অবস্থাকে বিশৃঙ্খল করে দেয়। মন খারাপ টানা  দুই-তিন সপ্তাহ স্থায়ী হলে তা বিষন্নতা। শতকরা ৭ জন এই রোগে ভুগেন।

রিলেটেডঃ ডিপ্রেশন কি? জেনে নিন ডিপ্রেশন দূর করার আল্টিমেট গাইড

বিষন্নতার লক্ষণ

  • মেজাজ অনেক খিটখিটে হওয়া
  • সব কিছু থেকে নিজেকে  গুটিয়ে রাখা
  • বন্ধু-বান্ধবের সাহচর্য এড়িয়ে চলা
  • কোনও কিছুতে আনন্দ খুঁজে না পাওয়া
  • ঘুম মাত্রাতিরিক্ত কম বা বেশি
  • ক্ষুধামন্দা,ওজন কমে যাওয়া
  • সব সময় নেতি্বাচক চিন্তা ভাবনা

বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন দুই  সপ্তাহের  বেশি স্থায়ী হলে তাকে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার বলে। একে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনও বলে।

বিষণ্নতা  অন্তত দুই বছর স্থায়ী হলে তাকে পারসিসটেন্ট ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার বলে। শারীরিক পরিশ্রম বা শরীরচর্চা ডিপ্রেশন কাটাতে সাহায্য করে। মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে হবে। এজন্য ইতিবাচক  মনোভাব পোষণ করা উচিত।

২) OCD বা শুচিবাই

সারা বিশ্বে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD) বা  শুচিবাই রোগীর সংখ্যা প্রচুর। ওসিডির দুইটি অংশ আছে । যথা –

অবসেশন (Obsession)  বা আচ্ছন্নতা: একই চিন্তা বার বার করাকে অবসেশন বলে।এই চিন্তা মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বার বার আসে। চিন্তাটি তিনি পছন্দ করেন না, বিরক্তি বোধ করেন তা স্বত্ত্বেও তিনি এটা বাদ দিতে পারেন না।

কম্পালশন (Compulsion) বা বাধ্যবাধকতা: আর কম্পালশন হল সেই চিন্তাটা বাস্তবে করে ফেলা।বার বার তিনি কাজটা করেও ফেলেন। কিন্তু কি জন্য করেন, তা তিনি নিজেও জানেন না। শুধু জানেন কাজটা করতে হবে।

কিছু পরিচিত  ওসিডি হলো -অকারণে বারবার হাত ধোয়া,  গণনা করা,  বারবার যাচাই করা,  গুছিয়ে রাখা এবং একই কথা বারবার বলা। ওসিডিতে কম্পালশন সব সময় নাও থাকতে পারে। অন্য অনেক মানসিক রোগের মত ওসিডিরও সঠিক কোনো কারণ এখনও আবিষ্কার হয়নি। মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ফাংশন কম,  কিছু নিউরোকেমিক্যালের তারতম্যের , জেনেটিক বিষয়গুলোকে এর কারণ হতে পারে। এসবের মধ্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সামান্য তারতম্যের বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

৩) সিজোফ্রেনিয়া

সিজোফ্রেনিয়া বা ভগ্নমনস্কতা সবচেয়ে মারাত্মক মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে তফাৎ ধরতে পারেন না। অবাস্তব দৃশ্য দেখা বা হ্যালুসিনেশান, অহেতুক সন্দেহপ্রবণতা (ডিল্যুশন), অবাস্তব চিন্তাভাবনা, অসংলগ্ন কথাবার্তা, গায়েবি আওয়াজ শোনা ইত্যাদি সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ। এসব লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সিজোফ্রেনিয়া সম্পুর্ণ নিরাময় করা যায় না। কিন্তু সঠিক চিকিৎসার দ্বারা এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সিজোফ্রেনিয়া
সিজোফ্রেনিয়া

৪) ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ

সাধারণত চল্লিশ বছরের বেশি বয়সে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। বিশ্বজুড়ে ৫০মিলিয়ন মানুষ ডিমনেশিয়ায় আক্রান্ত। এ রোগে আক্রান্ত মানুষের কিছুই মনে থাকে না। তার মস্তিষ্ক স্মৃতি সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। একটু আগে করা বা দেখা জিনিসগুলি বেমালুম ভুলে যান। দৈনন্দিন জীবনের কাজগুলো করা অনেক দুরূহ হয়ে পড়ে।

ডিমনেশিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ  হল আলঝেইমার, ভিটামিন বি১২ এর অভাব, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী কোষগুলোর ক্ষতি। টিউমার বা স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই রোগ হতে পারে। আলঝেইমার হল মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত রোগ, যার ফলে সাময়িক সৃতিভ্রংশ ঘটে।

৫) বাইপোলার ডিসঅর্ডার

বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা  দ্বি-প্রান্তিক ব্যাধি রোগে আক্রান্ত রোগী কখনও ডিপ্রেসশনে ভুগে কখনও বিষণ্নতা ডিপ্রেশনে রোগী কোন ও কাজে আনন্দ খুঁজে পান না। প্রত্যাহিক কাজগুলো ও করতে চান না। সবসময় ক্লান্তি অনুভব করেন। সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেন।খেতে চান না। ঘুম অস্বাভাবিক বাড়তে বা কমতে পারে। আত্মহত্যার করার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়,যা সর্বোচ্চ পর্যায় ডিপ্রেশনের।

অন্যদিকে ম্যানিয়া এর ঠিক বিপরীত। ম্যানিয়া হল কোনো ব্যক্তির মেজাজের সর্বোচ্চ পর্যায় যেমন –অত্যধিক খুশি। এ সময় অত্যধিক ইতিবাচকতা থাকে মনে। কাজে তার প্রবল আগ্রহ। অনেক আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ সময় ঘুম কম হয়।

৬) পোস্ট –ট্রমা স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PSTD)

কোন বড় আঘাত বা  ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর এই পোস্ট –ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার ঘটে। অতীতের স্মৃ্তি এমনভাবে তাড়া করে যে তিনি ঘুমাতে পারেন না। নাইটমেয়ার হয়ে যায় ঘটনাটা। চেষ্টা স্বত্তেও তিনি ভুলতে পারেন না।

৭) অনিদ্রা

Insomnia বা অনিদ্রাও কিন্তু মানসিক রোগ। পর্যাপ্ত ক্লান্তি থাকা স্বত্ত্বেও রাতে ঘুম না আসা, একটু পর পর ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া ও পরবর্তীতে ঘুম না আসা অনিদ্রার লক্ষণ। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তার ও মস্তিষ্কের নিউরোহরমোনাল অসামঞ্জস্য অনিদ্রার অন্যতম কারণ।

৮) পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার

পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার বা ব্যক্তিত্বের বিশৃঙ্খলা একটি মনের রোগ। এই রোগে যারা ভোগেন তাদের চিন্তার ধরণ  স্বাভাবিক মানুষ থেকে আলাদা। এরা একটু অস্বাভাবিক হয়। এদের ব্যবহার এবং অনুভূতিও অসুস্থ থাকে। ফলে তারাসামাজিক, পারিবারিক বা অন্যান্য কর্মকাণ্ডে ভালোভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেন না। কিন্তু তারা প্রতিনিয়ত-ই আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ান সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মত। বিভিন্ন ধরণের পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার আছে। যেমন-

  • অবসেসিভ-কম্পালসিভ পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার: এরা নিয়ম নীতি কঠোরভাবে মেনে চলতে চায় । একদম ঘড়ির কাঁটা  মেনে সবকিছু করতে চায়।সবকিছুর মধ্যে পারফেকশন খুঁজে বেড়ায় এরা, স্বভাবটা হয়ে যায় খুঁতখুঁতে।
  • বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার: এরা অস্তিত্বের সংকটে ভোগে, কারো সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক বজায় রাখতেপারেনা,  এদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ কেমন হবে তা আগে থেকে ধারণা করা যায় না। হঠকারী আচরণ করে, নিজের ক্ষতি নিজে করে ফেলতে পারে, হাত পা ধারাল অস্ত্র-ব্লেড দিয়ে কাটে, দেয়ালে মাথা ঠুকে ইত্যাদি।

৯) ক্লিপ্টোম্যানিয়া

চুরি করার স্বভাবকে বলে ক্লিপ্টোম্যানিয়া। এরা নিজেরা মনের অজান্তে চুরি করে।যে জিনিস চুরি করছে তা তাদের নিজেরও প্রয়োজন নাই। যেমন-অনেক ব্যক্তিগত  জিনিস। আমাদের সমাজে এমন মানুষ অনেক দেখা যায় বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে তা বেশি হয়। তাদের চোর বা হাত টানের স্বভাব আছে না বলে চিকিৎসা করানো দরকার।

১০) অটোফ্যাজিয়া

মানব-মস্তিষ্কে সুপ্ত অবস্থায় লুকিয়ে থাকা অন্যতম ভয়ংকর একটি মানসিক সমস্যা এটি। একজন অটোফ্যাজিয়া রোগীর স্থায়ী অনুভবশক্তি বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। এমনকি সে তার নিজের অঙ্গচ্ছেদ করে তা রান্না করে খেতেও মানসিক প্রশান্তি লাভ করে থাকে। অটোফ্যাজিয়া যখন উচ্চতর লেভেলে পৌঁছায়, তখন মানুষ নিজেকেখেতেও দ্বিধাবোধ করে না। তারা মনে করে  বেঁচে থাকার জন্য  সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রয়োজন নেই। এটি দুর্লভ মানসিক রোগ।

মানসিক রোগের চিকিৎসা
ছবিঃ ট্যাবলেট

মানসিক রোগের চিকিৎসা

আধুনিক যুগে এসেও বহু মানুষ মানসিক রোগের উপসর্গগুলোকে জিন-ভূতের আছর, জাদু-টোনা-তাবিজ-আলগা বাতাসের প্রভাব, অশুভ আত্মা বা দূষিত রক্তের প্রভাব বলে বিশ্বাস করে। তারা এটিকে রোগ বলে মানতেই  চান না। অনেক অপচিকিৎসার যেমন- মন্ত্র, তাবিজ, ঝাড়ফুঁক, শিকল থেরাপি ইত্যাদির দ্বারস্থ হন। কিন্তু অন্য সব রোগের মত মানসিক রোগেরও চিকিৎসা আছে।

  • আমরা সবাই জানি,মানুষের আচার-আচরণ বা কোনো কাজ সম্পাদিত হওয়ার পূর্বে মানসিক প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রিত হয়। মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক পদার্থ—যাকে বলা হয় নিউরোট্রান্সমিটার মানসিক প্রক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।
  • কারও মানসিক রোগ হলে তাঁর নিউরোট্রান্সমিটারের ঘাটতি বা বাড়তিজনিত পরিবর্তন দেখা দেয়। এই জায়গাতেই ওষুধের কাজ। ওষুধ নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য রক্ষা করে মানসিক রোগকে নিরাময় বা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
  • আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাইফলক জিন থেরাপিকে। এটিকে মানসিক রোগের  চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারন জিন বংশগতির বাহক। যাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে।
  • মানসিক রোগ হওয়ার জন্য মস্তিষ্কের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক উপাদানের ভূমিকা অনেক। সে কারণে এ চিকিৎসায় সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্বও কম নয়।
  • সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং রোগীর জ্ঞানের বিকাশ, আচার-আচরণ ও মনের গড়নের ওপর কাজ করে। তাকে যৌক্তিক আচরণ করতে উদ্বুগ্ধ করে। এর সাথে সামাজিক সহায়তা দেয় বাড়তি নিরাপত্তা ও সমাজে টিকে থাকার সাহস।
  • ইয়োগা, মেডিটেশন, নিয়মিত এক্সারসাইজ, পুস্টিকর খাদ্য গ্রহণ রোগীদের সুস্থ্য রাখতে সাহায্য  করে।

কিছু কিছু মানসিকে রোগীকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। তখন তাদের মানসিক রোগের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া উচিত। চিকিৎসা গ্রহণ করার পূর্বেই সাইকিয়াট্রিস্ট বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের প্রশিক্ষণ সম্পর্কে ভালো করে জেনে নিতে হবে।

রিলেটেডঃ ডিপ্রেশন কি? জেনে নিন ডিপ্রেশন দূর করার আল্টিমেট গাইড

চিকিৎসা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা

মানসিক রোগ নিয়ে কুসংস্কারের পাশাপাশি এর মূলধারার চিকিৎসা নিয়েও সাধারন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে। যেমন –

  • মানসিক রোগের ওষুধ আজীবন খেতে হয়, এই রোগ মানুষের ব্রেনকে আরও নষ্ট করে দেয় ইত্যাদি।
  • ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী আজীবন ওষুধ খেয়ে যান। আর চোখের সমস্যায় যিনি চশমা পড়েন তিনি মেনে নিয়েছেন আজীবন চশমা পড়তে হবে। সমাজ এটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। কিন্ত মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এই মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রটি এখনো তৈরি হয়নি।
  • মানসিক রোগের ওষুধ কখনো কখনো দীর্ঘ মেয়াদে সেবন করতে হয়। কিছু কিছু রোগের ক্ষেত্রে আজীবন।

আবার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভয় পেয়ে অনেকে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মানে ওষুধের বিষক্রিয়া নয়। যেকোনো ওষুধের, এমনকি সাধারণ প্যারাসিটামল ওষুধেরও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এটি মেনে নিয়েই সব রোগের ওষুধ দেওয়া হয়। আশার কথা হল, বর্তমানে  দ্বিতীয় প্রজন্মের মেডিসিন এ রোগের চিকিৎসা্য ব্যবহৃত হয়। এ মেডিসিনগুলির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রথম প্রজন্মের মেডিসিন থেকে অনেক কম।

চিকিৎসা কেন্দ্র

আপনারা অনেকেই চিন্তিত হয়ে থাকেন মানসিক রোগের চিকিৎসা কেন্দ্র নিয়ে, বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সরকারিভাবে মানসিক রোগের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে, চলুন দেখে নেওয়া যাক কোথায় মানসিক রোগের চিকিৎসা করাবেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টটিউট

২০০০ সালে রাজধানীর শেরে-ই-বাংলা-নগরে স্থাপন করা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। মাত্র ১০ টাকার টিকেটে  এখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ ও সাইকোথেরাপি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের অন্য কোন হাসপাতালে মানসিক রোগের এত ভালো চিকিৎসা বা ওষুধ নেই। নামমাত্র মূল্যে আরও অনেক সেবা মানসিক রোগীদের প্রদান করা হয়।অনেক রোগী এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে এখন সুস্থ সাবলিল জীবন-যাপন করেছেন।

অন্যান্য

এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোরোগের চিকিৎসা পাওয়া যায়। সব বড় বড় মেডিকেল কলেজে সাইক্রিয়াট্রিক ইউনিট আছে। তবে বাংলাদেশের প্রথম মানসিক হাসপাতাল স্থাপন করা হয় পাবনার হেমায়েতপুরে। ১৯৫৭ সালে এটির কার্যক্রম শুরু হয়। এখন এর কার্যক্রম নিয়ে এখন একটু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে সাইকোথেরাপি বা কাউন্সিলের সুলভ মূল্যে দক্ষতার সঙ্গে করানো হয়।


মানসিক রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা নিয়ে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন।

আমাদের করণীয়

মানসিক রোগীদের প্রতি আমাদের করণীয়

  • মানসিক রোগীকে পাগল,বদ্ধ, উন্মাদ প্রভৃতি অসম্মানজনক শব্দ বলা পরিহার করা।
  • তাদের সামাজিকভাবে বর্জন না করা।
  • পরিবারে আপনজন কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন না। তার পাশে থাকে তাকে মানসিক শক্তি দিন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। মানসিক রোগ অন্য আরেকটি রোগের মত রোগ। ওষুধ দীর্ঘমেয়াদি হলেও তা চালিয়ে যেতে হবে। হুট করে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।

মানসিক রোগে সচেতনতা

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও কাজ করার জন্য ১৯১২ সালের লুনাসি আইন ১০৬ বছর পরে বাতিল করা হয়েছে।  ২০১৮ সালে প্রণয়ণ করা হয়েছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি আইন। মানসিক স্বাস্থ্যের কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে, যার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত । এছাড়া মানসিক রোগের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য নিচের কাজগুলি করা যেতে পারে।

  • সারা বিশ্বে প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হয়। এ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য মানসিক রোগীর পরিবর্তে রোগের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
  • ফেসবুক, টেলিভিশন ও পত্র-প্রত্রিকায় বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা নিয়ে তথ্য প্রচার করতে হবে।
  • বহির্বিশ্বের মত মানসিক রোগ নিয়ে নাটক,সিনেমা নির্মাণ করা।
  • সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যের পরীক্ষা–নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো।
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ,অফিস বা কর্মস্থলগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করা ও মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী নিয়োগ করা।
  •  মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো ।

মানসিক রোগকে রোগ অন্যান্য শারীরিক রোগের মতোই একটি রোগ।একে নেতিবাচকভাবে দেখা ঠিক না।নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নিতে হবে। অন্যকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে হবে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বাইরে অস্বাভাবিক, গুরুতর লক্ষণ বা আচরণ দেখা দিলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে।

বিঃদ্রঃ  এই ব্লগের প্রত্যেকটা ব্লগ পোস্ট Sylhetism ব্লগের নিজস্ব ডিজিটাল সম্পদ। কেউ ব্লগের কোন পোস্ট কিংবা আংশিক অংশ ব্লগের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কপি পেস্ট করে অন্য কোথাও প্রকাশ করলে ব্লগ কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার অধিকার রাখে। এবং অবশ্যই কপিরাইট ক্লাইম করে যে মাধ্যমে এই ব্লগের পোস্ট প্রকাশ করা হবে সেখানেও কমপ্লেইন করা হবে।

এই ব্লগের কোন লেখায় তথ্যগত কোন ভুল থাকলে আমাদের Contact পেইজে সরাসরি যোগাযোগ করুন, আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তথ্য যাচাই করে লেখা আপডেট করে দিবো।

এই ব্লগের কোন স্বাস্থ বিষয়ক পোস্টের পরামর্শ নিজের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিবেন, আমরা স্বাস্থ বিষয়ে কোন বিশেষজ্ঞ না, আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ হচ্ছে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা। সুতারাং কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার অবশ্যই আমরা নিবো না।

ধন্যবাদ, ব্লগ কর্তৃপক্ষ।

Author

2 thoughts on “মানসিক রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা, মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায় ২০২২”

  1. ম্যাডাম আপনি খুব সুন্দর লিখেছেন। সহজ সাবলীল ভাষায় বুঝিয়েছেন মানসিক রোগ সম্পর্কে। এরকম আরও নতুন নতুন বিষয় নিয়ে আপনার লিখা পড়তে চাই।

  2. মোঃ নুর জামাল

    আমার শরীর অনেক দুবল পা চাবায় ঘাড়ের রগ টান কান টান মাথা জাম লাগা দুই চোয়াল টান চোখ ঝাপসা মাথা ধরা সহ অনেক সমসা আমি কি করব?

Leave a Comment

Your email address will not be published.

You cannot copy content of this page