জি এম ফসল বলতে কি বুঝ? জিএম ফসল কী?

জি এম ফসল বলতে কি বুঝ

নানা সব পরীক্ষা নিরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে প্রথম জি এম ফসল বাজারজাত করা হয় ১৯৯৬ সনে। সে সময় ১.৭ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে জি এম ফসল আবাদ করা শুরু হয়। গত চৌদ্দ বছরে জি এম ফসলের আবাদি এলাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪৮ মিলিয়ন হেক্টরে। এই পরিসংখ্যান থেকে এটি স্পষ্ট দেখা যায় যে, জি এম ফসলের আবাদি এলাকার পরিমাণ বেড়েছে ৮৭ গুণ। ২০১০ সনে পৃথিবীর ২৯টি দেশে জি এম ফসলের বিভিন্ন রকম জাত আবাদ করা হয়েছে। উনত্রিশটি দেশের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার হেক্টর বা তার চেয়ে অধিক পরিমাণ জমিতে জি.এম ফসলের আবাদ করা হচ্ছে মােট সতেরটি দেশে। যাই হোক, আজকের লেখাতে আমরা জানবো জি এম ফসলের ইতিহাস, জি এম ফসল কি, জি এম ফসল বলতে কি বুঝায় ইত্যাদি। জি এম ফসল কি জানতে হলে বা এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে আপনাকে আগে জি এম ফসলের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। তাহলে চলুন দেখে নেই  জি এম ফসলের ইতিহাস।

ইতিহাস

এখন থেকে আট দশ হাজার বছর পূর্বে মানুষ ফসল আবাদের কাজটি শুরু করে। আর তখন থেকেই শুরু হয় ফসলের নানারকম রূপান্তর তথা ফসল উন্নয়ন। কার্যক্রম | ফসলের কোষস্থ ক্রোমােজোমের মধ্যে অবস্থিত ডি এন এ অণুর মধ্যে সৃষ্ট স্বতঃস্ফুর্ত পরিবর্তন নানারকম বৈশিষ্ট্যে যে পরিবর্তন নিয়ে আসতাে তার উপর চলতাে প্রাকৃতিক আর মানুষের কৃত্রিম নির্বাচন। তাছাড়া ফসলের নিজস্ব কোষ বিভাজন কৌশল ও পর-পরাগায়ন মিলে ফসলের বৈশিষ্ট্যে যে লক্ষণীয় পরিবর্তন। নিয়ে আসতাে তার উপরও চলতাে প্রাকৃতিক আর কৃত্রিম নির্বাচন। এভাবে নানা বৈশিষ্ট্য রূপান্তরের মাধ্যমে চলতাে আগের দিনের ফসল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। তখনও মানুষ জানতােনা কিভাবে বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রিত হয়, কিভাবেই বা তা পিতামাতা থেকে বাহিত হয় সন্তানে সন্তানে আর কেইবা বহন করে নিয়ে যায় এসব বৈশিষ্ট্য। |

গত শতাব্দীর গােড়াতে এসে মানুষ জানতে পারে বংশগতির রহস্য। গ্রেগর যােহান মেণ্ডেল মটর নিয়ে তার বিখ্যাত গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষের কাছে এ রহস্য উন্মােচন করেন ১৮৬৫ সনে। তার ব্যাখ্যা বুঝতে বিজ্ঞানীরা ব্যর্থ হওয়ায়। বংশগতির রহস্য উন্মােচনে আরও লেগে যায় পঁয়ত্রিশটি বছর। বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতে এসে বংশগতির সূত্র দু’টি পুনরাবিস্কৃত হওয়ায় ফসল উন্নয়ন এক নতুন মাত্রা পায়। জানা সম্ভব হয় কিভাবে বৈশিষ্ট্য বাহিত হয় পিতামাতা থেকে সন্তানে। কিন্তু তখনও অজানা রয়ে যায় এ সত্যটি কে বহন করে নিয়ে যায় নানা বৈশিষ্ট্য প্রকাশের তথ্যাবলী। অর্থাৎ তখনও অনাবিস্কৃত থেকে যায় ডি.এন.এ.-এর কথা।

জি এম ফসল বলতে কি বুঝ
জি এম ফসল

১৯৫৩ সনে এসে বিজ্ঞানী ওয়াটসন এবং ক্রিক আবিস্কার করেন ক্রোমােজোমের মধ্যকার ডি.এন.এ. অণুর গঠন রহস্য। এরপর থেকে শুরু হয়। ডি.এন.এ নিয়ে ব্যাপক ভিত্তিক গবেষণা। ক্রমে ক্রমে জানা সম্ভব হয় কিভাবে কাজ করে ডি.এন.এ.। জানা সম্ভব হয় এ কথা যে, ডি.এন.এ. এর কার্যকর এক একটি অংশ হল ‘জিন’। এসব জিন-ই আসলে নিয়ন্ত্রণ করে যতসব বৈশিষ্ট্য। জানা যায় জিন-এর গঠন এবং জিনের কার্যাবলী সম্পর্কিত নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতােমধ্যে জীবে সংযােজন কৌশলও। এভাবে আবিস্কৃত হয়েছে রিকম্বিনেন্ট ডি.এন.এ. প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তির প্রায়ােগিক কর্মকাণ্ড শুরু হয় যে পদ্ধতি অনুসরণ করে তারই নাম জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। আর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল প্রয়ােগ করে যে ফসল তৈরি করা হয় সে ফসলের নাম ট্রান্সজেনিক ফসল। মিডিয়া এ ফসলের নাম দিয়েছে জেনেটিক্যালী মডিফাইড বা জি এম ফসল। বিজ্ঞানীরা একে বায়ােটিক ফসল নামেও আখ্যায়িত করেন।

ট্রান্সজেনিক নামটি এসেছে ট্রান্সজিন’ থেকে। কোন একটি ফসলের নিজস্ব প্রজাতির বাইরে থেকে আহরিত জিনকে ট্রান্সজিন বলা হয়। আর ফসলের দূর সম্পর্কিত প্রজাতি বা অনাত্মীয় কোন প্রজাতি বা পরিবার বা অন্য কোন উৎস থেকে আহরিত ট্রান্সজিন ফসলে সংযােজন করে যে ফসলের জাত তৈরি করা হয় তাকে ট্রান্সজেনিক ফসল বলা হয়। জিন প্রকৌশল পদ্ধতি ব্যবহার করে যেকোন জীব বা অণুজীব থেকে জিন আলাদা করে এখন তা ফসলে সংযােজন করে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ফসলে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য। আরও বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী জিন বিভিন্ন উৎস থেকে ফসলে সংযােজনের কাজও চলছে। পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষণাগারে।

প্রচলিত ফসল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাফল্য নেহায়েত কম নয়। উল্লেখযােগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক ফসলের ফলন। প্রচলিত ফসল উন্নয়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে মূলত একটি প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ধরনের জাত বা উদ্ভিদসমূহের মধ্যে বৈশিষ্ট্য স্থানান্তর সম্ভব হয়। অনেক সময় ফসল উন্নয়নের জন্য কাঙ্ক্ষিত জিন এক প্রজাতির জাতগুলাের মধ্যে পাওয়া যায় না। অথচ ঐ ফসলের অন্য প্রজাতিতে বা অন্য গণে বা অন্য ফসলের কোন প্রজাতিতে বা গণে ঐ কাক্ষিত জিনটি বিদ্যমান থাকলে ফসলের সাথে ঐ প্রজাতি বা গণের উদ্ভিদের যৌন মিলন ঘটানাে সম্ভব হয় না। বলে, তা আমাদের নির্দিষ্ট ফসলে আহরণ করা সম্ভব হয় না। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য কিন্তু কোন ফসলের উত্তম জাতে অভাব রয়েছে তেমন বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী একটি বা দুটি জিন অন্য প্রজাতি বা গণ থেকে আহরণ করা। অনেক বেশি সংখ্যক জিন অন্য প্রজাতি থেকে উত্তম জাতে চলে আসলে ঐ জাতটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যই নষ্ট হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে জিন স্থানান্তরের মূল লক্ষ্যই কিন্তু ব্যাহত হয়।

এতোক্ষণ আমরা জি এম ফসলের ইতিহাস জানলাম, চলুন এবার দেখে নেই জি এম ফসলের সংজ্ঞা বা জি এম ফসল কী।

জি এম ফসল বলতে কি বুঝ

উপরের আলোচনা থেকে আমরা খুব সহজেই বুঝেছি জি এম ফসল আসলে কি, এবার চলুন সংক্ষেপে দেখে নেই জি এম ফসল বলতে কি বুঝ’আয়।

  • সহজ করে বললে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল প্রয়ােগ করে যে ফসল তৈরি করা হয় সে ফসলকে জেনেটিক্যালী মডিফাইড বা জিএম ফসল বলে। বিজ্ঞানীরা একে বায়ােটিক ফসল নামেও আখ্যায়িত করেন।
  • আবার এভাবেও বলা যায়, কোন একটি ফসলের নিজস্ব প্রজাতির বাইরে থেকে আহরিত জিনকে ট্রান্সজিন বলা হয়। আর ফসলের দূর সম্পর্কিত প্রজাতি বা অনাত্মীয় কোন প্রজাতি বা পরিবার বা অন্য কোন উৎস থেকে আহরিত ট্রান্সজিন ফসলে সংযােজন করে যে ফসলের জাত তৈরি করা হয় তাকে ট্রান্সজেনিক ফসল বা জি এম ফসল বলা হয়।
  • বিজ্ঞানিক পদ্ধতি সংকরায়ন ও ক্রমাগত নির্বাচনের মাধ্যমে ফসলের বংশগতি (জিনের) পরিবর্তন করে যে নতুন ফসল উৎপাদন করা হয় তাকে জি এম ফসল বলে।
  • জি.এম. এর পূর্ণরূপ হলো (genetically modified)। জেনেটিক্যালি মডিফাইড হলো উদ্ভিদের জীনকে মডিফাই বা পরিবর্তন করে ঐ ফসলের উৎপাদন বাড়ানো। আর এভাবে উতপাদিত ফসলকে জি এম ফসল বলে।

তথ্যসুত্রঃ বই- ফসল উন্নয়ন ও প্রযুক্তি – ডাঃ মোঃ শহীদুর রশিদ ভূঁইয়া

বিঃদ্রঃ  এই ব্লগের প্রত্যেকটা ব্লগ পোস্ট Sylhetism ব্লগের নিজস্ব ডিজিটাল সম্পদ। কেউ ব্লগের কোন পোস্ট কিংবা আংশিক অংশ ব্লগের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কপি পেস্ট করে অন্য কোথাও প্রকাশ করলে ব্লগ কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার অধিকার রাখে। এবং অবশ্যই কপিরাইট ক্লাইম করে যে মাধ্যমে এই ব্লগের পোস্ট প্রকাশ করা হবে সেখানেও কমপ্লেইন করা হবে।

এই ব্লগের কোন লেখায় তথ্যগত কোন ভুল থাকলে আমাদের Contact পেইজে সরাসরি যোগাযোগ করুন, আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তথ্য যাচাই করে লেখা আপডেট করে দিবো।

এই ব্লগের কোন স্বাস্থ বিষয়ক পোস্টের পরামর্শ নিজের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিবেন, আমরা স্বাস্থ বিষয়ে কোন বিশেষজ্ঞ না, আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ হচ্ছে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা। সুতারাং কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার অবশ্যই আমরা নিবো না।

ধন্যবাদ, ব্লগ কর্তৃপক্ষ।

Author

You cannot copy content of this page