কার্বলিক এসিড কি? কার্বলিক এসিড ব্যবহারের গাইড

কার্বলিক এসিড

কার্বলিক এসিড একটি জৈব যৌগ যা একটি ফেনল গ্রুপ এবং একটি হাইড্রক্সিল গ্রুপ দ্বারা গঠিত। এটি প্রাকৃতিকভাবে একটি ক্রিস্টালিন কঠিন সুগন্ধি যৌগ হিসাবে পাওয়া যায়। কার্বলিক এসিড সাধারণত পেট্রোলিয়াম থেকে নিষ্কাশনের মাধ্যমে বড় আকারে উৎপাদন করা হয়।

ইতিহাস

১৮৩৪ সালে, জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডলিয়েব ফার্ডিনান্ড রঞ্জ কার্বলিক এসিড আবিষ্কার করেন, যা ফেনল নামেও পরিচিত। ১৮৬৫ সালের আগস্টে,  জোসেফ লিস্টার এটিকে এন্টিসেপ্টিক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি এগারো বছরের একটি ছেলের ক্ষতস্থানে কার্বলিক এসিড দ্রবণে ডুবানো একটি লিন্টের টুকরো প্রয়োগ করেছিলেন। এর  চার দিন পর, তিনি প্যাডটি পুনর্নবীকরণ করেন এবং আবিষ্কার করেন যে সেই ছেলের পায়ে কোন সংক্রমণ হয়নি, এবং মোট ছয় সপ্তাহ পরে তিনি আবিষ্কার করতে পেরে অবাক হয়ে গেলেন যে ছেলের পা একদমই ভাল হয়ে গিয়েছে।

কার্বলিক এসিডের গন্ধ কেমন?

কার্বলিক এসিড একটি মিষ্টি গন্ধযুক্ত তরল। এটিতে বিভিন্ন পণ্য যোগ করা হয়। কার্বলিক এসিড বিষক্রিয়া ঘটে যখন কেউ এই রাসায়নিক স্পর্শ করে বা গ্রাস করে। নাকের সামনে এই এসিড নিলে বেশ ঝাঝালো গন্ধ পাওয়া যায়।

কার্বলিক এসিডের ব্যবহার

কার্বলিক এসিড শিল্প ও ভোক্তা পণ্য প্রয়োগে ব্যবহৃত হয়। একটি খুব বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ যা কিছু উদ্ভিদ থেকেও পাওয়া যায়। কার্বলিক এসিড প্লাস্টিক, নাইলন, ইপক্সি, সাবান, ওষুধ এবং জীবাণু ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়।  এটি ফেনল নামেও পরিচিত। নিম্নে এর কিছু নির্দিষ্ট ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হলঃ 

প্লাস্টিক

প্লাস্টিক  তৈরিতে কার্বলিক এসিড একটি সাধারণ ব্যবহার। এই এসিড প্লাস্টিক এর ছাঁচ নির্মানে সাহায্য করে থাকে।  এটি ছাঁচযুক্ত প্লাস্টিকের পণ্যের একটি বড় অবদান রাখে। এটি প্লাস্টিকের ঘর্ষণ রোধ করতে ব্যবহার করা হয়। কার্বলিক এসিডকে এসিটোন দিয়ে বিক্রিয়া করে তৈরি করা হয় যা বিসফেনল এ গঠনের দিকে পরিচালিত করে। তাই  প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির জন্য এটি সাধারণ ব্যবহার। আজকের পৃথিবীতে প্লাস্টিক ছাড়া জীবন অসম্ভব বলে মনে হয়।  প্লাস্টিক আমাদের রুটিন জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে আমরা মনে করি।  প্লাস্টিকের তৈরিতে এসিড উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

সাবান তৈরিতে কার্বলিক এসিড

 এই সাবানকে কার্বলিক সাবান হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। এটি একটি হালকা এন্টিসেপটিক সাবান যা কার্বলিক এসিড এবং ক্রেসাইলিক অ্যাসিড দিয়ে তৈরি করা হয়। এই সাবানের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল এর রং। এই সাবানের রং  গোলাপী থেকে লাল রঙ এর হয়ে থাকে।  লাল রঙের সংযোজনটি এই কারণে এই সাবানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। কার্বোলিক সাবানটি যখন সাধারণ মানুষের কাছে প্রথম চালু করা হয়েছিল তখন এটি ছিল একমাত্র জীবাণুনাশক সাবান। রেড ক্রস এবং অন্যান্য ত্রাণ সংস্থাগুলি দ্বারা নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি জন্য এটি এখনও দুর্যোগের শিকার মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। 

ব্যথানাশকে কার্বলিক এসিড

কার্বলিক এসিড আপনার মুখের চারপাশে ব্যথা বা জ্বালা উপশম করতে সাহায্য করে। কার্বলিক এসিড ফ্যারিঞ্জাইটিসের লক্ষণগুলির জন্য একটি স্বল্পমেয়াদী চিকিৎসা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাল সংক্রমণ থেকে আপনার গলা ফুলে গেলে এটি ঘটে। মুখ এবং গলা ব্যথার জন্য  এই এসিড ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় এবং ছোট মাত্রায় ব্যবহার করা নিরাপদ।  কিন্তু গলার স্প্রে এবং এন্টিসেপটিক তরল এক সময়ে কয়েক বারের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়।  যদি আপনার জ্বর এবং বমির মতো উপসর্গ থাকে তাহলে এটি ব্যবহার থেকে দূরে থাকুন।

ব্যাকটেরিয়া নিরাময়ে কার্বলিক এসিড

এই এসিড কার্যকর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি-ফাঙ্গি এবং অ্যান্টি-ভাইরাল এজেন্ট হিসেবে প্রমাণিত।  এই বৈশিষ্ট্যগুলির পিছনে এর কাজের প্রক্রিয়া খুঁজে বের করার জন্য প্রচুর গবেষণা করা হয়েছে।  এটি কিছু গবেষণার দ্বারা অনুমান করা হয়েছে যে এটি অণুজীবের প্রোটিন এবং আরএনএ সংশ্লেষণকে বাধা দেয়, যার ফলে তাদের জীবাণুকে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে।  এছাড়াও, কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে যে এটি অণুজীবের সাইটোপ্লাজমিক ঝিল্লির ক্ষতি করে।

কার্বলিক এসিড এর সূত্র কি?

কার্বলিক এসিড ফিনলের একটি অপ্রচলিত নাম, যা হাইড্রক্সিবেঞ্জিন নামেও পরিচিত।  এটি পানিতে অ্যাসিড বিক্রিয়া করে।  এটি ত্বকের জন্যও বেশ বিষাক্ত। উদাহরন সরুপ আমরা এমন একজন ব্যক্তির কথা শুনেছি যিনি তার পায়ে এক কাপ এই এসিড পড়ে গিয়েছিল, তারপরে তাত্ক্ষণিকভাবে তার পায়ে পানি ঢালার পরও  তিনি কার্বলিক এসিড এর বিষক্রিয়ায় মারা যান। এটিতে C6H5OH এর আণবিক সূত্র রয়েছে। এটি ঠিক বেনজিন রিং এর মতো। এই যৌগটি একটি বেনজিন রিং যার মধ্যে হাইড্রোজেন এর একটি হাইড্রক্সিল গ্রুপ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

আরো পড়ুনঃ ফরমালিনের সব খুঁটিনাটি

কার্বলিক এসিড এর বিষ ক্রিয়া

কার্বলিক এসিড একটি মিষ্টি গন্ধযুক্ত তরল।  বিভিন্ন পণ্য ব্যবহারে এটি যোগ করা হয়।  কার্বলিক এসিড বিষক্রিয়া ঘটে যখন কেউ এই রাসায়নিকটি স্পর্শ করে বা গ্রহন করে। নিম্ন লক্ষনগুলো পড়লেই বুঝতে পারবেন যে এই এসিড কতটা বিষাক্ত।

কার্বলিক এসিড
কার্বলিক এসিড বিষাক্ত হয়ে থাকে

 এসিড গ্রহনের ফলে

  • এই এসিড গ্রহনে তীব্র পেট ব্যথা  হতে পারে।
  • এই এসিড গ্রহনে রক্তাক্ত মল হতে পারে।
  • এই এসিড গ্রহনে ডায়রিয়ার মত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এসিডের সংস্পর্শে আসার ফলে

  • এই এসিডের সংস্পর্শে আসলে বমি বমি ভাব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
  • এই এসিডের সংস্পর্শে আসলে নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে।
  • এই এসিডের সংস্পর্শে আসলে দ্রুত হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে।

ব্যবহারে বেশ কিছু সতর্কতা

কার্বলিক এসিড এর ব্যবহার এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা হতে পারে, তবে এটি বিষাক্ত হতে পারে বা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে যদি আপনি এটি উচ্চ পরিমাণে ব্যবহার  করেন। এই এসিডের সতর্কতা নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলঃ 

কর্মক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন

শিল্প কারখানায় এই এসিডের  সংস্পর্শে আসার কারণে আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।  তবে এটি আংশিকভাবে কার্বলিক এসিড ছাড়াও অন্যান্য অনেক শিল্প রাসায়নিকের সংস্পর্শের কারণে হতে পারে।

এসিড ধারণকারী কিছু খাবেন না

এই এসিডকে তার বিশুদ্ধ আকারে গ্রহণ করলে আপনার খাদ্যনালী, পেট, অন্ত্র এবং অন্যান্য পাচন অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে।  আপনি যদি এটি বেশি পরিমাণে গ্রহন করে ফেলেন তাহলে আপনার শরীরে  মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

এটি আপনার ত্বকে লাগাবেন না

 বিশুদ্ধ ফেনল আপনার ত্বকের ক্ষতি করতে পারে যদি আপনি এটি সরাসরি ব্যবহার করে ফেলেন। এটি যদি সরাসরি আপনার  ত্বকে লেগে যায় তাহলে   পোড়া এবং ফোসকা পরার মত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কার্বলিক এসিডে নিশ্বাস নেবেন না

ল্যাবরেটরিতে কাজ করে এমন লোকেরা এই এসিডের কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই কেউ যদি এই এসিডে নিশ্বাস নেয় তাহলে এর মারাত্মক সাস্থ্যঝুকি  হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘদিন এই এসিডের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

কার্বলিক এসিড পান করবেন না

প্রচুর পরিমাণে এই এসিড যুক্ত পানি খাওয়া আপনার পেশীগুলিতে খিঁচুনি  দিতে পারে এবং আপনার হাঁটার ক্ষমতাকে নস্ট করে দিতে পারে। তাই এর ব্যবহার সম্পর্কে এখনই সচেতন হন।

সাপের উপদ্রব থেকে বাচতে কার্বলিক এসিড

আপনি ইতিমধ্যে জেনে এসেছেন যে কার্বলিক এসিডের তীব্র গন্ধ রয়েছে। যার ফলে  সাপ এই গন্ধকে ঘৃণা করে। আপনি জেনে অবাক হবেন যে সাপের গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা পৃথিবীতে সর্বাধিক। সাপের ঘ্রাণশক্তি এত বেশি সেটি আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। সাপ সহজেই কুকুরের চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি গন্ধ পেতে সক্ষম। অতএব সাপ কার্বলিক এসিডের ঘ্রান অনেক দূর পর্যন্ত অনুভব করতে পারে এবং সেই জায়গা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় সাপ।

দ্বিতীয়ত আমরা ইতিমধ্যে জেনে এসেছি যে  কার্বলিক এসিড ত্বকের জন্য খুবই ক্ষতিকর। অতএব  কার্বলিক এসিড যদি সাপ উপর গিয়ে কোন ভাবে পরে তাহলে এই এসিড দ্বারা সাপের চামড়া খুব কম জ্বলবে এবং কিছু সময় পর সেই সাপ অবশ্যই মারা যাবে। 

সাপ দমনে এই যেভাবে ব্যবহার করবেন

  • প্রথমে কার্বলিক এসিডকে একটি কাচের পাত্রে ভরে নিবেন। আপনি যদি এই এসিডকে প্লাস্টিকের পাত্রে রাখেন তাহলে এটি গলে যাবে। তাই কাচের পাত্রে এই এসিড সংগ্রহ করুন।
  • তারপর কাচের পাত্রটির মুখ এর মধ্যে একটি ছোট ফুটো করে দিন।
  • বাড়ির আশেপাশে এই বোতলটি রেখে দিন। ফলাফল হিসাবে দেখবেন যে সাপ আপনার বাড়ির আশেপাশে আসবে না। তবে বাচ্চাদের নাগালের বাইরে রাখুন।

সতর্কতাঃ

বাজারে অনেক ধরনের নকল কার্বলিক এসিড পাওয়া যায়। তাই সঠিকভাবে এর ফলাফল পেতে আসল এসিড সংগ্রহ করুন। আমি একটি লিংক দিয়ে দিচ্ছি এইখান থেকে আপনি এই এসিড সংগ্রহ করতে পারেন।

লিংকঃ কার্বলিক এসিড

বিঃদ্রঃ এই ব্লগের প্রত্যেকটা ব্লগ পোস্ট Sylhetism ব্লগের নিজস্ব ডিজিটাল সম্পদ। কেউ ব্লগের কোন পোস্ট কিংবা আংশিক অংশ ব্লগের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কপি পেস্ট করে অন্য কোথাও প্রকাশ করলে ব্লগ কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার অধিকার রাখে। এবং অবশ্যই কপিরাইট ক্লাইম করে যে মাধ্যমে এই ব্লগের পোস্ট প্রকাশ করা হবে সেখানেও অভিযোগ সাবমিট করা হবে।

ধন্যবাদ, ব্লগ কর্তৃপক্ষ।

যেসব প্রশ্ন বেশি জিজ্ঞেস করা হয়

 

প্রশ্নঃ কার্বলিক এসিডের অপর নাম কি?

✅ উত্তরঃ ফেনল (Phenol)

প্রশ্নঃ কার্বলিক এসিড এর সংকেত কি

✅উত্তরঃ C6H5OH

প্রশ্নঃ কার্বলিক এসিড সাপ তাড়াতে পারে?

✅ উত্তরঃ হ্যা, পারে।

প্রশ্নঃ এই এসিডের দাম কত?

✅উত্তরঃ দাম ৭০-১০০টাকার মধ্যে

প্রশ্নঃ এই এসিড কিভাবে কিনবো?

✅উত্তরঃ সাধারণত কার্বালিক এসিড ফার্মিসি কিংবা কীটনাশকের দোকানে পাওয়া যায়।

Author

1 thought on “কার্বলিক এসিড কি? কার্বলিক এসিড ব্যবহারের গাইড”

Leave a Comment

You cannot copy content of this page