ড্রাগন ফল

ড্রাগন ফল কি? জেনে নিন ড্রাগন ফলের উপকারিতা ও অপকারিতা

সম্প্রতি বাজারে বহুল পরিচিত একটি ফল হলো ‍ড্রাগন ফল। দেখতে অদ্ভুত ও  অন্যরকম এই ফল আমাদের দেশে নতুন। তবে ড্রাগন ফল এর বিশেষ চাহিদা রয়েছে ফলের বাজার গুলোতে। অন্যান্য ফলের চেয়ে এর দাম তুলনামূলক বেশি হলেও এর পুষ্টিগুণ ও দেখতে আকর্ষনীয় হওয়ায় এর চাহিদার অনেক। এখানে আমরা জেনে নিবো বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করা এই ড্রাগন ফল কী? এর উৎপত্তি, উপকারিতা, অপকারিতা ইত্যাদি সম্পর্কে। বৈচিত্র্যপূর্ণ এই ফল সম্পর্কে জানতে পুরো লেখাটা পড়ার অনুরোধ থাকছে। 

ড্রাগন ফল কী

ড্রাগন ফল ক্যাকটাস (Cactus) জাতীয় গাছের ফল। যা হাইলোসেরিয়াস ক্যাকটাস গাছে জন্মে থাকে। ডিম্বাকৃতির উজ্জ্বল গোলাপি রঙের এই ফলের বৈজ্ঞানিক নাম হলো, Hylocereus undatus. এই গাছ হনলুলু কুইন বা রাতের রানী হিসেবেও পরিচিত। কারণ এর ফুল শুধু মাত্র্র রাতেই ফোটে। ফুল লম্বাটে সাদা ও হলুদ রঙের হয়। অনেকটা ‘Knight Queen’ ফুলের মত। এর গাছ দেখতে Euphorbia গোত্রের ক্যাকটাসের মতো। তবে এর গাছ পাতাবিহীন। ফুলের পরাগায়ন নিজে নিজেই হয়ে থাকে। অন্যান্য পতঙ্গ যেমন, মাছি, মৌমাছি ও পোকা-মাকড় ও পাখির দ্বারাও পরাগায়ন হয়ে থাকে । তারা পরাগায়ণকে ত্বরান্বিত করে পরাগয়ণ প্রক্রিয়াকে দ্রুত করে । এছাড়াও কৃত্রিম ভাবেও  পরাগায়ন করা যেতে পারে।

ড্রাগন ফুল
ফটোঃ ড্রাগন গাছের ফুল দেখতে যেমন (Photo Source: gettyimages.com)

উৎপত্তিস্থল

ড্রাগন ফল দক্ষিণ মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকায় খুব বেশি পরিমাণে জন্মে থাকে। সেন্ট্রাল আমেরিকাতে এ ফলটি ১৩শ শতাব্দীতে প্রথম চিহ্নিত করা হয়। তখন সেখানেই এই ফলের উৎপাদন হতো। অন্যান্য যায়গায় এর প্রচলন তখন শুরু হয়নি।  দক্ষিন এশিয়ায় উৎপাদন শুরু হয় বিংশ শতাব্দিতে এসে। এশিয়ার মধ্যে মালয়েশিয়াতে প্রথম শুরু হলেও বর্তমানে ভিয়েতনামে বানিজ্যিক ভাবে সবচেয়ে বেশি ড্রাগন ফল চাষ করা হয়। এই ফল এখন দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ চীন, ইসরাইল, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড,মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিক ভাবে ব্যাপক চাষ হচ্ছে।  বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদ লাভজনক হওয়ায় আমাদের দেশের চাষীদের কাছে ব্যাপক সমাদৃত।

প্রকারভেদ ও নামকরণ

আমরা এই ফলটি কে ড্রাগন ফল নামে চিনলেও এর আরো অনেক নাম আছে। এটি পিটায়া, পিটাহায়া এবং স্ট্রবেরি নাশপাতি সহ  আরো অনেক নামে পরিচিত। এই ফলের সবুজ আঁশযুক্ত উজ্জ্বল লাল ত্বক রয়েছে যা দেখতে ড্রাগনের পিঠের মতো। যার কারণে এই ফল ড্রাগন ফল নামে পরিচিত।

ড্রাগন ফলের যে জাত সব থেকে বেশি পাওয়া যায় তা হলো, কালো বীজের সাথে সাদা সজ্জা রয়েছে, যদিও লাল সজ্জা(pulp)  এবং কালো বীজের সাথে একটি কম পরিচিত ধরণ ও পাওয়া যায়।

এছাড়া আরো আরেকটি জাতে ড্রাগন ফল দেখা যায়, যাকে হলুদ ড্রাগন ফল বলা হয়। এর বহিরাবরণ হলুদ এবং ভেতরে কালো বীজ সহ সাদা সজ্জা(pulp) রয়েছে।

এই ফল দেখতে অন্য রকম ফলের মতো না হলেও, এর স্বাদ অন্যান্য ফলের মতোই । এর স্বাদ কিউই এবং  নাশপাতির স্বাদের মিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এটি খেতে হালকা মিষ্টি স্বাদ লাগে। 

ফটোঃ ড্রাগন গাছ
ফটোঃ ড্রাগন গাছ (Photo Source: gettyimages.com)

ড্রাগন ফলের পুষ্টি উপাদান

পুষ্টির জন্য ড্রাগন ফল একটি আদর্শ ফল। এই ফলে অল্প অল্প পরিমাণে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এটি আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফাইবারের একটি ডিসেন্ট সোর্স।

 এই ফলে প্রতি  3.5 আউন্স, বা 100 গ্রাম পরিবেশনের জন্য যে পরিমাণ পুষ্টির পাবেন তা হলো,

ক্যালোরি

এতে আপনি 60 ক্যালোরি শক্তি পাবেন। অর্থাৎ ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফল থেকে এই পরিমাণ ক্যালোরি অনায়াসে পাবেন যা আপনার ক্যালোরির চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রোটিন

এতে প্রোটিনের মাত্রা তুলনামূলক কম আছে। ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলে 1.2 গ্রাম প্রোটিন পাবেন।

চর্বি

 চর্বির পরিমাণ একেবারেই নেই।  0 গ্রাম। অর্থাৎ ফ্যাট নিয়ে ভাবার কোন চিন্তা থাকবে না।

কার্বোহাইড্রেট

 কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ মোটামুটি রয়েছে।  13 গ্রাম কার্ব পাবেন প্রতি ১০০ গ্রাম থেকে।

ফাইবার

 ড্রাগন ফলে  পরিমাণ মতো ফাইবার ও রয়েছ। এতে আপনি 3 গ্রাম ফাইবার পাবেন।

ভিটামিন সি

 ভিটামিন সি এর উৎস ও ড্রাগন ফল, এতে  RDI এর 3% পেয়ে যাবেন।

আয়রন

আমাদের দেহের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আয়রন রয়েছে এতে। এই ফলে RDI এর 4% আয়রন পাওয়া যাবে।

ম্যাগনেসিয়াম

দেহের জন্য উপকারী ম্যাগনেসিয়ামও পাওয়া যাবে  RDI এর 10%।

উচ্চ পরিমাণে ফাইবার এবং ম্যাগনেসিয়াম, সেইসাথে অত্যন্ত কম ক্যালোরি উপাদানের কারণে, ড্রাগন ফলকে একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর-ঘন ফল হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সুতরাং পুষ্টির বিবেচনায় ড্রাগন ফল একটি উত্তম ফল। এটি আপনার পুষ্টির চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই ড্রাগন ফল খওয়ার অভ্যাস করা উচিত।

ড্রাগন ফলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান

ড্রাগন ফলের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুলো এমন ধরণের  এমন যৌগ যা আপনার কোষকে ফ্রি র‌্যাডিকেল নামক অস্থির অণু থেকে রক্ষা করে, যা দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং এবং আপনার বার্ধক্যের সাথে তথা, বয়সের সাথে দেহের তারতম্য বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করে।

ড্রাগন ফলে বেশ কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে।  ড্রাগন ফলের সজ্জার (pulp) মধ্যে থাকা কিছু প্রধান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট  হলো,

  • বেটালাইনস: এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান  লাল ড্রাগন ফলের সজ্জায় (pulp) পাওয়া যায়, এই গভীর লাল রঙ্গকগুলি “খারাপ” এলডিএল(“bad” LDL) কোলেস্টেরলকে অক্সিডাইজড বা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
  • হাইড্রোক্সিসিনামেটস: অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট  যৌগগুলির এই গ্রুপটি টেস্ট-টিউব এবং প্রাণী গবেষণায় ক্যান্সারবিরোধী কার্যকলাপ প্রদর্শন করে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
  • ফ্ল্যাভোনয়েডস: অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের এই বৃহৎ, বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী উন্নত মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাসের সাথে যুক্ত । সুতরাং এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের জন্য খুব দরকারী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

একটি বিশেষ গবেষণায় 17টি গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল এবং বেরির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের তুলনা করা হয়েছে।

যদিও ড্রাগন ফলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা বিশেষভাবে খুব বেশি ছিল না, তবে এটি নির্দিষ্ট ফ্যাটি অ্যাসিডকে ফ্রি র‌্যাডিক্যাল ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য সর্বোত্তম বলে প্রমাণিত হয়েছে ।

ড্রাগন ফলের স্বাস্থ্য সুবিধা

ড্রাগন ফলের বেশ কিছু স্বাস্থ্য সুবিধা রয়েছে। প্রাণীদের (ইদুরের) একটি গবেষণায় দেখা যায় যে ড্রাগন ফল বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করতে পারে। এর মধ্যে অনেকগুলি সম্ভবত এর ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান থাকার কারণে।

Ø  ড্রাগন ফলের লাল এবং সাদা উভয় প্রকার স্থূল ইঁদুরের ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং ফ্যাটি লিভার কমাতে দেখা গেছে ।

Ø  একটি গবেষণায়, উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবারে ইঁদুর যারা ফলের নির্যাস পেয়েছিলেন তাদের ওজন কম হয়েছে এবং তাদের লিভারের চর্বি, ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রদাহ হ্রাস পেয়েছে, যা অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াতে উপকারী পরিবর্তনের জন্য দায়ী করা হয়েছিল।

Ø  ড্রাগন ফলের মধ্যে রয়েছে প্রিবায়োটিক ফাইবার যা আপনার অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে – সম্ভাব্য বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি করে ।

Ø  এই ফলটি বিপাকীয় সিন্ড্রোমের কিছু বৈশিষ্ট্যকে উন্নত করতে পারে । এটি টাইপ 2 ডায়াবেটিসের সাথে সম্পর্কিত   একটি অবস্থা ।  তবে সমস্ত প্রভাব অনুকূল তথা উপকারী না ও হতে পারে না।

Ø  উচ্চ-চর্বিযুক্ত, উচ্চ-কার্ব ডায়েটে ইঁদুরের উপর করা একটি গবেষণায়, ড্রাগন ফলের রস গ্রহণকারী গ্রুপের রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া ভাল ছিল এবং কিছু লিভার এনজাইম মার্কার হ্রাস পেয়েছিল, যখন অন্য একটি লিভার এনজাইম চিহ্নিতকারী উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ।

Ø  অন্য একটি গবেষণায়, ফলের নির্যাস দিয়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুরদের ম্যালন্ডিয়ালডিহাইড 35% হ্রাস পেয়েছিল, যা ফ্রি-র্যাডিক্যাল ক্ষতির চিহ্নিতকারী। কন্ট্রোল গ্রুপের তুলনায় তাদের কম ধমনী দৃঢ়তা ছিল।

মানুষের মধ্যে টাইপ 2 ডায়াবেটিসে ড্রাগন ফলের প্রভাবের উপর পরীক্ষার সঠিক ফলাফল পওয়া যায়নি। তবে  এই উপকারী প্রভাবগুলো নিশ্চিত করার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন ।

ড্রাগন ফলের চাষ

এই ফলের চাষ ধারণা পেতে নিচের ভিডিও টি দেখতে পারেন।

ড্রাগন ফলের উপকারিতা ও অপকারিতা

 ড্রাগন ফলের অপকারিতার চেয়ে এর উপকারিতার মাত্রা বেশি। আমরা শুরুতেই জেনে নিবো এর উপকারিতা।

উপকারিতা

ড্রাগন ফলের উপকারিতা গুলো হলো

দীর্ঘস্থায়ী রোগের জন্য উপকারি

ড্রাগন ফল এ থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো ফ্রি র‌্যাডিকেল এর বিরুদ্ধে কাজ করে।   ফ্রি র‌্যাডিকেল হল অস্থির অণু যা কোষের ক্ষতি করে, যা প্রদাহ এবং রোগের কারণ হতে পারে। ড্রাগন ফলের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার মাধ্যমে এটি মোকাবেলা করার একটি উপায়। কারণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্রি র‌্যাডিকেল নিরপেক্ষ করতে কাজ করে, এইভাবে কোষের ক্ষতি এবং প্রদাহ প্রতিরোধ করে।

ড্রাগন ফলের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ।

  • ভিটামিন সি: পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় ভিটামিন সি গ্রহণ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। উদাহরণ স্বরূপ, 120,852 জন মানুষের উপর করা একটি সমীক্ষায় ভিটামিন সি বেশি খাওয়ার সাথে মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সার কম হয় ।
  • বেটালাইনস: টেস্ট-টিউব পরীক্ষায় পাওয়া যায় যে, বেটালাইন অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে এবং ক্যান্সার কোষগুলিকে দমন করার ক্ষমতা থাকতে পারে ।
  • ক্যারোটিনয়েডস: বিটা-ক্যারোটিন এবং লাইকোপিন হল উদ্ভিদের রঙ্গক যা ড্রাগন ফলকে এর প্রাণবন্ত রঙ দেয়। ক্যারোটিনয়েড সমৃদ্ধ খাবারগুলি ক্যান্সার এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

আর আমরা জানি যে, প্রকৃতিক ভাবে গ্রহণ করা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের জন্য অনেক উপকারী।  তাই এর জন্য ড্রাগন ফল উত্তম একটি ফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ফাইবারে ভরপুর

খাদ্য তালিকায় থাকা ফাইবার হজমযোগ্য কার্বোহাইড্রেট যা সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সুবিধাগুলোর একটি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মহিলাদের জন্য প্রতিদিন 25 গ্রাম এবং পুরুষদের জন্য 38 গ্রাম ফাইবার গহণ করতে  সুপারিশ করেন। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মতো, কৃত্রিম ফাইবার  খাবারের ফাইবারের মতো স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান করতে পারে না।

প্রতি এক কাপ পরিবেশন 7 গ্রাম ফাইবার পাবেন। তাই  ড্রাগন ফল একটি উন্নত খাদ্য উৎস।

ফাইবার সম্ভবত হজমের ক্ষেত্রে তার ভূমিকার জন্য সবচেয়ে সুপরিচিত, গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে এটি হৃদরোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা, টাইপ 2 ডায়াবেটিস পরিচালনা এবং স্বাস্থ্যকর শরীরের ওজন বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে

কিছু পর্যবেক্ষণ গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার কোলন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে পারে তবে তাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এর উচ্চ-ফাইবার সামগ্রী আপনাকে আপনার দৈনিক চাহিদার খাদ্যমানগুলো পূরণ করতে সহায়তা করতে পারে।

তবে এটি খেয়াল রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে উচ্চ-ফাইবারযুক্ত খাবারের ত্রুটি থাকতে পারে, বিশেষ করে যদি আপনি কম ফাইবারযুক্ত খাবারে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন। পেটের অস্বস্তি এড়াতে, ধীরে ধীরে ডায়েটারি ফাইবার গ্রহণের পরিমাণ বাড়ান এবং প্রচুর পরিমাণে তরল পান করুন।

ড্রাগন ফল
ফটোঃ ড্রাগন ফল

অন্ত্র স্বাস্থ্যকর রাখে

আমাদের অন্ত্রে প্রায় 100 ট্রিলিয়ন বৈচিত্র্যময় অণুজীবের আবাসস্থল, যার মধ্যে 400 টিরও বেশি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। অনেক গবেষক বিশ্বাস করেন যে অণুজীবের এই সম্প্রদায় আপনার স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। মানব এবং প্রাণী উভয় গবেষণায় আপনার অন্ত্রে ভারসাম্য বজায় না থাকলে  হাঁপানি এবং হৃদরোগের মতো রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। ড্রাগন ফলের মধ্যে প্রিবায়োটিক রয়েছে, এটি  আপনার অন্ত্রে  ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রিবায়োটিক হল একটি নির্দিষ্ট ধরণের ফাইবার যা আপনার অন্ত্রে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে থাকে। অন্যান্য ফাইবারের মাতো এই ফাইবার গুলো অন্ত্র ভাঙতে পারে না। অন্ত্রে থাকা স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া গুলো এদের ভক্ষন করে থাকে। এবং বৃদ্ধি পায়। এভাবে অন্ত্রে অনুজীবের ভারসাম্য বজায় থাকে।

ড্রাগন ফল প্রধানত দুই ধরণের  স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়ার পরিবারের বৃদ্ধি করে থাকে। যেমন, ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া এবং বিফিডোব্যাকটেরিয়া।

নিয়মিত প্রিবায়োটিক খেলে আপনার পাচনতন্ত্র এবং ডায়রিয়াতে সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে। এর কারণ হল প্রিবায়োটিকগুলি ভাল ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করতে সাহয্য করে। যা স্বাস্থ্যে জন্য খারাপ ব্যাকটেরিয়ার সাথে লড়াই করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, ভ্রমণকারীদের মধ্যে একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা ভ্রমণের আগে এবং ভ্রমণের সময় প্রিবায়োটিক গ্রহণ করেছিলেন তারা অন্যান্য ভ্রমণকারীদের থেকে কম এবং কম গুরুতর ডায়রেয়াতে আক্রান্ত হয়েছিলো।

কিছু গবেষণায় আরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে প্রিবায়োটিকগুলি প্রদাহজনক অন্ত্রের রোগ এবং কোলন ক্যান্সারের লক্ষণগুলি কমাতে পারে। তবে, এই ফলাফলগুলো এখনো পুরোপুরি শত ভাগ নিশ্চিত নয়।  

প্রিবায়োটিকের উপর অনেক গবেষণা ভালো ফলাফল দিয়েছে।  ড্রাগন ফলের প্রিবায়োটিক কার্যকলাপের উপর গবেষণা শুধুমাত্র টেস্ট-টিউব অধ্যয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মানুষের অন্ত্রে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ড্রাগন ফল ইমিনিউ সিস্টেমকে শক্তিশালী করে

সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আপনার শরীরের ক্ষমতা আপনার খাদ্যের গুণমান সহ বিভিন্ন বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে।

ড্রাগন ফলের ভিটামিন সি এবং ক্যারোটিনয়েড আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং আপনার শ্বেত রক্তকণিকাকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে সংক্রমণ প্রতিরোধ করে থাকে। যাতে করে রক্তে  শ্বেত রক্তকণিকা এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

আপনার ইমিউন সিস্টেম এ থাকা শ্বেত রক্তকণিকা ক্ষতিকারক পদার্থকে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করতে সাহায্যে করে। যা ফ্রী র‌্যাডিকেল ধ্বংস করার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে থাকে। এতে যতটা ঝুকি থাকে শ্বেত রক্তকণিকার দ্বারা ততটা থাকে না। কারণ আমরা জানি শ্বেত রক্তকণিকার কাজই হলো জীবনু ভক্ষণ করা।

শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে, ভিটামিন সি এবং ক্যারোটিনয়েডগুলি ফ্রী র‌্যাডিকেল গুলোকে নিরপেক্ষ করতে পারে এবং আপনার শ্বেত রক্তকণিকার ব্যবহার কমিয়ে তাকে  রক্ষা করতে পারে।

যেভাবে ড্রাগন ফল পরিবেশন করা হয়
যেভাবে ড্রাগন ফল পরিবেশন করা হয়

আয়রন লেভেল বাড়াতে সাহায্য করে

যে কয়েকটি তাজা ফলের মধ্যে আয়রন রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো ড্রাগন ফল। এতে নির্দিষ্টি পরিমাণে আয়রন আছে। যা আপনার আয়রনের চাহিদা পূরণ করতে সাহয্য করে। পাশাপাশি যাদের নিম্ন আয়রন লেভেল ( Low Iron Level)  তাদের আয়রন লেভেল বাড়াতে সাহায্য করে থাকে।

 আয়রন আপনার সারা শরীরে অক্সিজেন পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও এটি খাদ্যকে শক্তিতে ভাঙ্গাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে

আপনি জানলে অবাক হবেন যে, অনেক মানুষ পর্যাপ্ত আয়রন পান না। প্রকৃতপক্ষে, এটি অনুমান করা হয়েছে যে বিশ্বের জনসংখ্যার 30% আয়রনের ঘাটতি, এটি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে সাধারণ পুষ্টির ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। সুতরাং আয়রনের এ ঘাটতি পূরণে ড্রাগন ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

কম আয়রনের মাত্রা মোকাবেলা করার জন্য, বিভিন্ন আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। আয়রনের সমৃদ্ধ উৎসের মধ্যে রয়েছে মাংস, মাছ, লেবু, বাদাম এবং সিরিয়াল।

ড্রাগন ফল আরেকটি দুর্দান্ত বিকল্প হতে পারে, কারণ প্রতিবার পরিবশেন করা ড্রাগন ফল আপনার দৈনিক চাহিদার (RDI) 8% প্রদান করে থাকে। এটিতে ভিটামিন সিও রয়েছে, যা আপনার শরীরকে আয়রন শোষণ করতে সাহায্য করে ।

এছাড়াও আয়রনস্বল্পতার কারণে চুল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে ড্রাগন ফল গ্রহণ করলে তা আয়রণ স্বল্পতার বিরুদ্ধে কাজ করে। এবং চুল পড়া কমতে পারে। এছাড়াও আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার অন্যান্য উপসর্গ প্রশমিত করতে সাহায্য করে।   অত্যধিক ক্লান্তি, ত্বকের বিবর্ণতা, মনোনিবেশে সমস্যা, মাথাব্যথা ও হাত-পায়ে ঠান্ডা অনুভূতি থেকে মুক্তি দিতে ড্রাগন ফল কর‌্যকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

ম্যাগনেসিয়ামের ভালো উৎস

ড্রাগন ফলে বেশিরভাগ ফলের চেয়ে বেশি পরিমাণে ম্যাগনেসিয়ামের যোগান দেয়, মাত্র এক কাপে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা RDI-এর 18%।

গড়ে, আপনার শরীরে 24 গ্রাম  বা এক আউন্স ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে। এই আপাতদৃষ্টিতে অল্প পরিমাণ মনে হলেও খনিজটি আপনার প্রতিটি কোষে উপস্থিত থাকে এবং আপনার শরীরের মধ্যে 600 টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় । সুতরাং দেহের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য ম্যাগনেসিয়াম খুব জরুরি  একটি উপাদান।

উদাহরণস্বরূপ, এটি খাদ্যের শক্তিতে ভাঙ্গন, পেশী সংকোচন, হাড় গঠন এবং এমনকি DNA  তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়াগুলিতে অংশ নেয়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় ম্যাগনেসিয়ামের উচ্চতর গ্রহণ হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে । তবে তার জন্য আরো গবেষণা করে নিশ্চিত হতে হবে।

আরও দেখায় যে ম্যাগনেসিয়াম পর্যাপ্ত খাবারগুলি হাড়ের স্বাস্থ্যকে ভালো রাখতে সাহায্য করে থাকে। সুতরাং ম্যাগনেসিয়ামের অভাব পূরণ করতে ড্রাগন ফল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

ড্রাগন ফলের অপকারিতা

  • সবদিক থেকে ড্রাগন ফল নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে। তবে একটি বিষয়ে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। এই ফল অ্যালার্জির জন্য বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেটা খুবই বিরল। এছাড়াও যাদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য এই ফল নিয়মিত গ্রহণে অ্যালার্জির সমস্যা বাড়তে পারে। তাই তাদের এ ক্ষেত্রে সাবাধানতা অবলম্বন করা জরুরি।  
  • এছাড়ও আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে যেসব নারীদের খাবারে অ্যালার্জির কোনো সমস্যা নেই তাদের মাঝে কিছু ক্ষেত্রে, অন্যান্য ফলের সাথে ড্রাগন ফল মিশিয়ে জুস খাওয়ার ফলে অ্যানাফিল্যাকটিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। পরীক্ষা নিশ্চিত করেছে যে তাদের রক্তে ড্রাগন ফলের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি রয়েছে ।
  • এছাড়াও অতিরিক্ত ড্রাগন ফল গ্রহণে এই ধরণের সমস্যা দিতে পারে। তাই এসব ব্যাপার মাথায় রেখে ড্রাগন ফল গ্রহন করা উচিত। অন্যথায় ড্রাগন ফল আপনার দেহে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খুব বেশি পরিমাণে ড্রাগন ফল না খাওয়া ই ভালো একটি পরিমাণ মতো এই ফল খেলে আপনি এ থেকে সুফল পাবেন।

কীভাবে খাবেন

দেখতে অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর মনে হলেও ড্রাগন ফল কাটা বা খাওয়া জটিল বা ঝামেলার না। এটি খুব সহজেই খেতে পারবেন।

ড্রাগন ফল কীভাবে খাবেন তা এখানে বর্ণনা করা হলো.

উজ্জ্বল লাল, সমানভাবে রঙিন ত্বকের সাথে একটি পাকা ফল নির্বাচন করুন যাতে চাপ দিলে সামান্য ডেবে যায়( পাকা আম যেমন নরম থাকে)

একটি ধারালো ছুরি ব্যবহার করে ফলটি ফলটি মাঝ বারবার কেটে দুই টুকরো করতে হবে। এর পরই আপনি একটি চামচ ব্যবহার করে ভেতরে পাল্প গুলো খেতে পারেন। ইচ্ছে করলে ত্বকের খোসা ছাড়িয়ে সজ্জাটিকে(pulp)  ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিতে পারেন।

ড্রাগন ফল পরিবেশনের ধারণা

সহজভাবে এটিকে টুকরো টুকরো করে খাবেন।

এটিকে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিন এবং উপরে গ্রীক দই এবং কাটা বাদাম দিয়ে দিন।

এটিকে আপনি সালাদেও ব্যবহার করতে পারবেন।

এভাবে আপনি আপনার প্রয়োজন বা চাহিদা মতো ড্রাগন ফল খেতে পারবেন।

শেষ বাক্য

খুব অল্প বিরূপ প্রভাব ফেললেও ড্রাগন ফল খুব উপকারী ফল তা আমরা এখান থেকে বুঝতে পারলাম। যদি আমরা খাবার তালিকায় পুষ্টিকর নতুন কিছু যুক্ত করতে চাই তার জন্য ড্রাগন ফল তার উপকারী সমাধান। কারণে এতে বিভিন্ন ধরণের পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে  এই ফল আমাদের দেশে একেবারেই নতুন। শুরুতে বিদেশ থেকে আমদানী করায় এর দাম ছিলো আকাশচুম্বী যা সকলের সামার্থ্যর মধ্যে ছিল না। তবে দিনে দিনে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় আমাদের দেশে ব্যপক ভাবে এই ফলের চাষ শুরু হয়েছে।  যাতে করে বিদেশ থেকে আমদানীর পরিমাণ কমবে ও স্বল্পমূল্যে সবার সাধ্যের মধ্যেই পাওয়া যাবে।

তথ্যসূত্র: 

১) https://www.healthline.com/nutrition/dragon-fruit

২) https://www.healthline.com/nutrition/dragon-fruit-benefits

৩) https://www.khaboronline.com/health/the-benefits-of-dragon-fruit-and-its-cultivation/

বিঃদ্রঃ 

এই ব্লগের প্রত্যেকটা ব্লগ পোস্ট Sylhetism ব্লগের নিজস্ব ডিজিটাল সম্পদ। কেউ ব্লগের কোন পোস্ট কিংবা আংশিক অংশ ব্লগের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কপি পেস্ট করে অন্য কোথাও প্রকাশ করলে ব্লগ কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার অধিকার রাখে। এবং অবশ্যই কপিরাইট ক্লাইম করে যে মাধ্যমে এই ব্লগের পোস্ট প্রকাশ করা হবে সেখানেও কমপ্লেইন করা হবে।

এই ব্লগের কোন লেখায় তথ্যগত কোন ভুল থাকলে আমাদের Contact পেইজে সরাসরি যোগাযোগ করুণ, আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তথ্য যাচাই করে লেখা আপডেট করে দিবো।

এই ব্লগের কোন স্বাস্থ বিষয়ক পোস্টের পরামর্শ নিজের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিবেন, আমরা স্বাস্থ বিষয়ে কোন বিশেষজ্ঞ না, আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ হচ্ছে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা। সুতারাং কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার অবশ্যই আমরা নিবো না।

ধন্যবাদ, ব্লগ কর্তৃপক্ষ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

You cannot copy content of this page