আকিকার নিয়ম কানুন, আকিকা কেন দেয়া হয়?

আকিকার নিয়ম কানুন

আকিকাহ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ কর্তন করা। আকিকা হলো একটি ইসলামি প্রথা, যে প্রথায় নবজাতক শিশুর জন্ম উপলক্ষে প্রাণী কুরবানী দেয়া হয়। এটি মুসলমানদের জন্য সুন্নত। সন্তানের মঙ্গলের জন্য মুসলমানরা আকিকার আয়োজন করে থাকেন। আকিকা হলো সুন্নাতে আল মু’আক্কাদাহ বা নিশ্চিত সুন্নত। অভিভাবকদের সামর্থ থাকলে সন্তানের জন্য একটি প্রানি কুরবানী দেয়া উচিত।

জাফর আল-সাদিকের অন্য একটি হাদীস অনুসারে, প্রত্যেক জন্মগ্রহণকারী নবজাতকের জন্য আকিকা বাধ্যতামূলক; যদি তারা সন্তানের জন্য আকিকাহ না করে তবে তা মৃত্যু বা এই ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।

আকিকার নিয়ম কানুন

আকিকার কিছু নিয়ম রয়েছে যেগুলোকে আকিকার নিয়মকানুন বলা হয়ে থাকে, এই লেখাতে আমরা চেষ্টা করবো ইসলামের আলোকে সেই নিয়মগুলি নিয়ে আলোচনা করতে।

জন্মের কত তম দিনে আকিকা দেয়া হয়

সাধারণত সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম। তবে যদি কোনো কারণবশত সপ্তম দিনে আকিকা না করতে পারে, তাহলে পরবর্তী যে কোনো সময়ে আদায় করতে পারবে। আকিকার দিনের হিসাব করা হয় চাঁদের হিসাবে।

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, যেসব মাসআলা দিন- তারিখ, মাস-বছরের সাথে সম্পৃক্ত; সেসবের হিসাব চাঁদের হিসাবে গণনা করতে হয়।শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৭ম দিনে আকিকা করতে হলে চাঁদের হিসাব অনুযায়ী করতে হবে। চাঁদের হিসাবে সূর্যাস্তের পর থেকে দিন তারিখ গননা করা হয়।

শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে তার জন্য আকিকা করতে হয়।সপ্তম দিনে যদি কেউ আকিকা আদায় করতে না পারে তবে ১৪ তম দিনে, ২১ তম দিনে ও আকিকা আদায় করতে পারবেন। তাই যদি কেউ এই সময়ের মধ্যে আকিকা দিতে না পারেন তবে সন্তানের যৌবনের আগে যে কোনও সময় আকিকা করতে পারে।

সন্তান বড় হয়ে গেলেও আকিকা করা যায়। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) নবুওয়াত পাওয়ার পর নিজের আকিকা নিজে করেছিলেন।’ (বায়হাকি)

বাচ্চা
বাচ্চা

আকিকা কে করবেন?

সন্তানের আকিকা দেয়ার দায়িত্ব তার পিতার। যদি পিতার সামর্থ্য না থাকে তাহলে মা সামর্থ্যবান হলে তিনি অথবা মা বাবার পক্ষ হতে দাদা-দাদি, নানা-নানি আকিকা আদায় করবেন।

অনেকে মনে করেন, আকিকার পশু নানার বাডি থেকেই আসা উচিত, কিন্তু এই ধারনাটি সম্পুর্ন ভুল।

আকিকার পশুর সংখ্যা

ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে একই ধরনের দুটি বকরি এবং মেয়ের ক্ষেত্রে থেকে একটি বকরি আকিকা করা সুন্নাত। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ৬/৩৩৬)

তবে কারো সামর্থ না থাকলে একটা ছাগল দিয়েও আকিকা করা যাবে। হজরত আলী (রা.) বলেন,“ রাসূল (সা.) একটি ছাগল দিয়ে হাসানের আকিকা দিলেন।” (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৬০২)

আকিকার পশুর ধরন

কোরবানির পশু আর আকিকার পশু নির্বাচনের নিয়ম একই। যেসব পশু দিয়ে কোরবানি দেয়া জায়েজ, সেসব পশু দিয়ে আকিকাও দেয়া যায়।

আকিকার পশু জবাইয়ের সময়

বেশ কিছু অঞ্চলে কুসংস্কার রয়েছে যে, যখন শিশুর মাথা মুন্ডানোর জন্য তার মাথায় ক্ষুর বসানো হবে তখন পশু জবাই দিতে হবে। এটি ভুল ধারনা। আগে মাথা মুন্ডানোও যাবে বা চাইলে আগে পশু জবাই করা যাবে।

কোরবানির পশুর সঙ্গে আকিকা করা

কোরবানির পশুর সঙ্গে আকিকা করা বৈধ। একটি পশুতে যদি তিন শরিক কোরবানি হলে সেখানে আরো দুই বা এক শরিক আকিকার জন্য দেয়া যাবে। কোরবানির ন্যায় একই পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হয়ে আকিকা দিতে পারবে (দুরারুল আহকাম ১/২৬৬)। বড় পশু হলে (গরু, মহিষ, উট) ছেলের জন্য এক শরিক আকিকা দিলেও হবে।

পশু
পশু

আকিকার দোয়া

আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও সন্তানের কল্যান কামনায় আকিকা করা হয়। আকিকা করা সুন্নত,আকিকা করলে সওয়াব পাওয়া যায় এবং আল্লাহর রহমতে সন্তান বিপদ আপদ থেকে দূরে থাকে।তাই আমাদের উচিত সঠিক নিয়ম কানুন মেনে সন্তানের আকিকা আদায় করা –

আকিকার দোয়া (বাংলা উচ্চারণ)

আল্লাহুম্মা হাযিহী আকিকাতু ইবনী ফুলানিন দামুহাবিদামিহী ওয়া লাহমুহা বিলাহমিহী ওয়া আজমুহা বিআযমিহী ওয়া জিলদুহা বিজিলদিহী ওয়া শা’রুহা বিশার’রিহী আল্লাহুম্মাজআলহা ফিদাআল্লি ইবনী মিনান্নার।

এরপর পড়বে 

ইন্নিওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি অল আরদা মিল্লাতা ইবরাহিমা হানীফাও অমা আনা মিনাল মুশরিকীন । ইন্না সলাতি ওয়া নুসুকি অমাহ ইয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন । লাশারিকালাহু ওয়াবিজালিকা ওমিরতু অ আনা আওয়ালুল মুসলিমীন ।আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়ালাকা বিছমিল্লাহি আল্লহুআকবার বলে জবাই করবে।

জবেহকারী যদি সন্তানের পিতা না হয় তাহলে ইবনী এর বদলে শিশু ও তার পিতার নাম বলবে মেয়ে হলে বিনতী বলবে এবং দামুহু ‘ লাহমুহু ‘আজমুহু ‘জিলদুহু ‘শারুহু ‘পড়তে হবে।

আকিকার গোশত বন্টনের নিয়ম

কোরবানির গোশতের মতোই এই গোশত বন্টন করা হয়। কাঁচা ও রান্না উভয় ভাবেই গোশত বণ্টন করতে পারবে। সবাই এই গোশত খেতে পারবে (ফাতাওয়ায়ে শামি : ৬/৩৩৬)

আকিকার গোশতও কুরবানির গোশতর মতো বন্টন করা উত্তম।কোরবানির মতো আকিকার পশুর গোশতও তিন ভাগ করতে হবে। এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য রেখে, এক তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনদের জন্য সদকা করে এবং বাকি  এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া সুন্নত।

আকিকার পশুর চামড়া বন্টন

কোরবানির মতোই আকিকার পশুর চামড়াও গরিব মিসকিনকে দিয়ে দিতে হবে। নিজে ব্যবহার করতে চাইলে তাও করা যাবে।কিন্তু  যদজ বাজারে বিক্রি করা হয় , তাহলে সেই টাকা গরিব -মিসকিনদের মধ্যে বন্টনকরে দিতে হবে।

সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে মুসলিম পিতা-মাতার করণীয়

  • সন্তানের সুন্দর একটি নাম রাখতে হবে, নাম বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এমন একটি নাম বাছাই করতে হবে যা শুনলেই বোঝা যাবে সে মুসলিম সন্তান।
  • মাথা কামানো৷
  • মাথার চুলের ওজন পরিমান সোনা বা রুপা দান করা৷
  • আকিকা করা৷  (৭ ম দিনে সম্ভব না হলে,১৪ তম,২১ তম কিংবা পরবর্তীতে যে কোনো সময় সামর্থ্য অনুযায়ী করা যাবে)

সন্তানের নাম রাখা

নাম রাখার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন নামটি শুনেই বুঝা যায় যে, নামটি মুসলিম সন্তানের। একবার নাম রাখার পর যদি পরবর্তীতে কোনো কারণে নাম পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়, তভে শুধু নাম পরিবির্তন করলেই হবে। নতুন করে আবার আকিকা দেয়ার প্রয়োজন নেই।

সন্তানের সুন্দর নাম রাখার গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হল, হাশরের ময়দানে সব ব্যক্তিকে তার নাম ও তার বাবার নামসহ ডাকা হবে। তাই সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা খুবই জরুরি।


সন্তানের আকিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন শাইখ আহমাদুল্লাহ

মৃত বাচ্চার আকিকা

অনেক শিশুই সময় মারা যায় বা মৃত শিশুই জন্ম নেয়। আকিকা করা হয় সন্তানের মংগল কামনায় এবং আকিকার মাধ্যমে নাম রাখা হয় তাই মৃত বাচ্চার আকিকা করতে হবে না। (আহসানুল ফাতাওয়া: ৭/৫৩৬)

আকিকার উপকারিতা

  • আকিকার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।
  • আকিকার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে সন্তান বিপদ আপদ থেকে মুক্ত থাকে।
  • সন্তানের আকিকার মাধ্যমে কিয়ামতের দিন পিতা সন্তানের সুপারিশের উপযুক্ত হয়।
  • আকিকার মাধ্যমে গরিব মিসকিন এবং আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় হয়।
  • আকিকায় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত দেয়া হয়, এতে করে সবার সাথে সম্পর্ক ভালো হয়। পরষ্পরের মাঝে হৃদ্যতা ও আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গাঢ় হয়।

আকিকা সম্পর্কে কিছু কুসংস্কার

  • অনেকেই মনে করে থাকেন যে, আকিকার গোশত দাদা-দাদি ও নানা-নানি খেতে পারবে না। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আকিকার গোশত মা বাবা, নানা নানি, দাদা দাদি সহ সব আত্বীয় স্বজন খেতে পারবেন।
  • সন্তানের মাথার চুল মুন্ডানোর জন্য যখন মাথার উপরের ক্ষুর টানা হবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই আকিকার জন্তু জবাই করতে হবে- এটি সম্পুর্ন ভিত্তিহীন একটা ধারনা। চাইলে আগে মাথা মুন্ডানো যাবে বা আগে কোরবানী করা যাবে।

হযরত আতা (রহ.) এর এক বর্ণনা মতে, আকিকার পশু জবাই করার আগে মাথা মুন্ডিয়ে নেওয়া উত্তম। (আল মুকাদ্দামাতুল মুমাহহাদাত ১/৪৪৯)

  • অনেকে ভাবেন, আকিকার অনুষ্ঠানে হাদিয়া বা উপহার দেওয়া ও গ্রহণ করা সুন্নত। কিন্তু এই ধারনাও ভুল।
  • আকিকা উপলক্ষে নবজাতকের নানার বাড়ির পক্ষ থেতে আকিকার পশু পাঠাতে হবে বা পোশাক ইত্যাদি পাঠাতে হবে, এমন ধারনাও হারাম।
  • কুসংস্কার আছে, আকিকার পশুর হাড় ও মাথা ভাংগা যাবে না এবং পশুর রক্ত শিশুর শরীরর মাখাতে হবে। এটি একটি ভুল ধারনা, আকিকার পশুর হাড় ও মাথা ভাংগা যাবে কিন্তু পশুর রক্ত বা কোনো অংশ শিশুর শরীরে মাখানো যাবে না।

পরিশেষে বলা যায়,আকিকার সাথে শিশুর সুরক্ষা রক্ষা , বিপদ আপদ দূর হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। তাই সামর্থ্য থাকলে দ্রুত আকিকা আদায় করা উচিত।আল্লাহ আমাদের সবাইকে আকিকা আদায় করার তৌফিক দান করুক। আমিন।

বিঃদ্রঃ Sylhetism ব্লগের কোন লেখায় তথ্যগত কোন ভুল থাকলে আমাদের Contact পেইজে সরাসরি যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো, আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তথ্য যাচাই করে লেখা আপডেট করে দিবো।

Sylhetism ব্লগের কোন স্বাস্থ বিষয়ক পোস্টের পরামর্শ নিজের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিবেন, আমরা স্বাস্থ বিষয়ে কোন বিশেষজ্ঞ না, আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ হচ্ছে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা। সুতারাং কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার অবশ্যই আমরা নিতে পারবো না। ধন্যবাদ, ব্লগ কর্তৃপক্ষ।

Author

You cannot copy content of this page