জন্ডিসের লক্ষণ কি? জানুন জন্ডিসের লক্ষণ ও সঠিক ঘরোয়া চিকিৎসা

জন্ডিস

জন্ডিসের সাথে আমরা সকলেই কম বেশি পরিচিত। হয় আমরা নিজেরা জন্ডিসে ভুগেছি নয়ত আমাদের আশেপাশে কারো হতে দেখেছি। কিন্তু কখনো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে কেন হয় জন্ডিস? জন্ডিসের লক্ষণ কি? কিভাবেই বা মুক্তি পাওয়া যাবে জন্ডিস থেকে?

জন্ডিস মূলত যকৃতের একটি রোগ। তবে রোগ বললে পুরোপুরি সত্যতা প্রকাশ পায় না। জন্ডিস বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ রোগের পূর্বাবস্থা হিসেবেও পরিচিত। তাই জন্ডিসকে যকৃতের কোন সমস্যার পূর্ব লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। তবে এছাড়াও জন্ডিস হবার নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন সিরোসিস, ভাইরাস সংক্রামন কিংবা মরণব্যাধি ক্যানসার। তাই জন্ডিসকে কোন ভাবেই অবজ্ঞা করা যাবে না। সঠিক সময়ে জন্ডিস থেকে নিস্তার পেতে জন্ডিসের লক্ষণ, কারণ, ও প্রতিকার গুলো এখনই জেনে নিন।

জন্ডিস কি?

আমাদের রক্তে যখন বিলিরুবিলের পরিমাণ অনেক বেশি বেড়ে যায়, তখন আমাদের গায়ের ত্বক, চক্ষু, ইউরিনে ও মুখে হলুদাভ বর্ণ দেখা যায়। এই অবস্থা কেই জন্ডিস বলে বিবেচনা করা হয়। আমাদের রক্তে থাকে লোহিত রক্ত কনিকা। যার ভাঙ্গনের ফলে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি হয়৷ এর মধ্যে একটি হচ্ছে বিলিরুবিন। এই বিলিরুবিন সরাসরি আমাদের লিভারে চলে যায়৷ এবং পরবর্তীতে এটি পিত্ত তে পরিনত হয়ে যায়।

কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন রক্তের লোহিত কণিকার ভাঙন আগের থেকে বেরে যায়। এমন হলে বিলিরুবিন বেশি বেশি তৈরি হতে থাকে। আর এত বেশি বিলিরুবিন পিত্ত তে পরিনত হতে পারে না। ফলে রক্তের মধ্যে বিলিরুবিন বেড়ে যায়। তাছাড়া পিত্ত সবসময় যকৃত থেকে বের হয়ে যায়। ফলে আমরা জন্ডিসে ভুগি না। তবে বিলিরুবিন এর মাত্রা বেশি থাকলে কিন্তু যকৃতে পিত্ত থেকে যেতে পারে। ফলে জন্ডিস হয়।

তাছাড়া ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, সিরোসিস এর কারণে আমাদের যকৃতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসময়েও যকৃত থেকে পিত্ত বের হয়ে যাবার পথে বাঁধা তৈরি হয়। এবং পিত্ত লিভারেই রয়ে যায়। এসব কারনেও জন্ডিস হতে পারে। এজন্যই জন্ডিস কে বার বার অন্য রোগের উপসর্গ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জন্ডিসের লক্ষণ
রোগের উপসর্গ

জন্ডিসের কারণ

যকৃতের কোনো ধরনের সমস্যাই জন্ডিসের আসল কারণ। আমরা যেসব খাবার খাই তা সব কিছু আমাদের যকৃতের প্রসেসিং হয়। আমাদের যকৃৎ বিভিন্ন কারণেই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিভিন্ন ভাইরাস যেমন, হেপাটাইটিস A B C D E যকৃৎ এ প্রদাহ তৈরি করে। একে বলে viral hepatitis। আমাদের দেশ এবং পৃথিবীর সকল দেশেই জন্ডিসের মেইন কারণ এই hepatitis  ভাইরাসগুলো। এছাড়া বেশ কিছু উন্নত দেশ রয়েছে যেখানে মদ্যপানের হার অনেক বেশি। এই মদ্যপান তাদের লিভারের ব্যপক ক্ষতি করে। ফলে লিভারের বিভিন্ন সমস্যার সাথে প্রচুর জন্ডিসে ভুগতে দেখা যায়৷

তাছাড়া খুবই রেয়ার একটি ডিজিজ আছে যার করাণে জন্ডিস হয়ে থাকে। এটি হল Autoimmune Liver Disease. বেশ কিছু ব্যক্তির মধ্যে বংশগত কারণেও ঘন ঘন জন্ডিস হতে দেখা দেয়। মুলত বংশগত ভাবে যাদের শরীরে লিভার ক্যান্সারের বীজ রয়েছে তাদেরকে প্রায়সই জন্ডিসে ভুগতে দেখা দেয়। এছাড়াও আরো অনেক জানা অজানা রেয়ার সমস্যার কারণেও জন্ডিস হয়ে থাকে।

এমন কিছু ওষধ আছে যেগুলো জন্ডিসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যথা নাশক ঔষধ ও বিভিন্ন ধরনের পিল এই সাইড ইফেক্ট দেখিয়ে থাকে। এছাড়াও অনেকের থ্যালাসেমিয়া রোগ থাকে যার একটি সুপ্ত উপসর্গ হল এই জন্ডিস। অনেক সময়ে Hemoglobin E Disease এর কারণে পিত্তে কিংবা পিত্ত নালীতে স্টোন তৈরি হয়। এগুলোও জন্ডিসের অন্যতম কারণ। পিত্তে টিউমর, লিভার টিউমর ও ক্যান্সারের কারণেও প্রাথমিক ভাবে প্রচুর জন্ডিস হতে দেখা যায়।

তবে জন্ডিস যে শুধুই লিভারের বিভিন্ন সমস্যার কারনে হয় এটি ভাবা ভুল। শরীরের বিভিন্ন যায়গার ক্যান্সার ও টিউমরের কারণেও জন্ডিস হতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে সাময়িক অনিয়মের কারণেও জন্ডিস হতে পারে৷ তবে এটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না বলা যায়।

আমরা জানি আমাদরে ব্লাডে যখন বিলিরুবিনের পরিমান অনেক বেড়ে যায় তখন জন্ডিস হতে দেখা যায়। আসুন জেনে নেই কি কি কারণে আমাদের ব্লাডে বিলিরুবিন হঠাৎ অনেক বেড়ে যায় ও জন্ডিস হয়-

১. কোনো কারণবশত লিভারের প্রদাহ

আমাদের যকৃতে কোনো প্রদাহ সৃষ্টি হলে সাথে সাথে ব্লাডে বিলিরুবিনের উৎপাদন এর পরিমাণ বাড়া শুরু করে। যার ফলে আমাদের সাময়িক সময়ের জন্য জন্ডিস হতে পারে। তবে আশা করা যায় যে পেটের প্রদাহ কমার সাথে সাথে জন্ডিসের অবস্থাও ইম্প্রুভ হবে।

২. পিত্ত থলিতে প্রদাহ

পিত্ত থলিতে কোনো প্রদাহ থাকলে লিভারে বিলিরুবিন শোষণ কার্যক্রম নষ্ট হয়। তাই বিলিরুবিন এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ও জন্ডিস হয়।

 ৩. পিত্তনালীতে ব্লক সৃষ্টি হওয়া

অনেক সময়ে আমাদের পিত্তনালীর মধ্যথেকে  ব্লক হয়ে যায়। এমন হলে যকৃৎ বিলিরুবিন অপসারণ করতে পারে না। এভাবে জন্ডিসের দিকে এগিয়ে যায়।

৪. গিলবার্ট’স সিনড্রোম এর কারণে বিলিরুবিন বৃদ্ধি

আমাদের কারোর গিলবার্টস সিনড্রম থাকলে শরীরে এনজাইমের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। তাই আমাদের পিত্ত রেচন কাজে ব্যাঘাত ঘট। ফলস্বরূপ ব্লাডে হয় বিলিরুবিনের অনেক বেশি বেড়ে যায় এবং জন্ডিস হয়।

৫. ডুবিন-জনসন সিনড্রোম এর কারণে বিলিরুবিন বৃদ্ধি

ডুবিন জনসন সিনড্রম একটি বংশগত রোগ। এই রোগটি আমাদের যকৃত থেকে বিলিরুবিন অপসারণ করতে বাধা দেয়। এভাবে জন্ডিস হবার ঝুঁকি বাড়ায়।

জন্ডিস কাদের বেশি হয়?

একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় ৭২ ঘন্টা বা তার বেশি বয়সী নবজাতক শিশুদের জন্ডিস হবার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এটি শারীরবৃত্তীয় জন্ডিসের স্বাভাবিক অগ্রগতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যা সাধারণত জন্মের ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে শীর্ষে থাকে। এবং তারপর ১০ দিনের মধ্যে বিলিরুবিনের মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

তবে জন্ডিস হবার সম্ভাবনা জাতিগত এবং ভূগোলের সাথে পরিবর্তিত হয়। পূর্ব এশিয়ান এবং আমেরিকান ভারতীয়দের মধ্যে এই ঘটনা বেশি এবং আফ্রিকানদের মধ্যে কম। গ্রীসের বাইরে বসবাসকারী গ্রীক বংশোদ্ভূতদের তুলনায় গ্রীসে বসবাসকারী গ্রীকদের ঘটনা বেশি। উচ্চ উচ্চতায় বসবাসকারী জনসংখ্যার মধ্যে ঘটনা বেশি। যেসব দেশের মানুষ অতিরিক্ত মধ্যপানে অভ্যস্থ সেসব দেশেও জন্ডিসের হার বেশি। বিশেষ কারণ বশত কারো শরীরে বিলিরুবিন বেশি থাকলেও তাদের জন্ডিসে ভোগার সম্ভাবনা বাড়ে।

বাচ্চাদের জন্ডিস
বাচ্চাদের জন্ডিস

জন্ডিসের লক্ষণ কি?

জন্ডিসের বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে যা অন্য রোগের লক্ষণের সাথে সম্পৃক্ত। তাই কয়েকটা লক্ষণ পর্যবেক্ষন করে তারপর নিশ্চিত হওয়া যায় জন্ডিস হয়েছে কিনা। নিচে উল্লেখিত জন্ডিসের লক্ষণ গুলো মিলিয়ে নিন-

চোখের রং পরিবর্তন

জন্ডিস হলে আপনি লক্ষ্য করবেন হঠাৎ করে আক্রান্ত রোগীর চেখের রং পরিবর্তন হচ্ছে। প্রথম দিকে হালকা চোখ জালা পোড়া থেকে শুরু হয়। এরপর আস্তে আস্তে চোখের প্রদাহ বাড়তে থাকে। অনেকে ডিহাইড্রেশন এর জন্য চোখ জ্বালা পোড়া করছে ভেবে একে অবহেলা করে। তবে চোখে ব্যথার সাথে সাথে যদি আপনার চোখের বর্ণ পরিবর্তন হতে থাকে তাহলে সেটি ঝুঁকির বিষয়।

প্রথম দিকে চোখ হালকা হলুদ থাকে। পরবর্তীতে চোখের রং গাড় হলুদ বর্ণ ধারন করে। এসময় থেকেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা নেয়া শুরু করতে হয়৷ নয়ত এর পরের স্টেজ গুরুতর স্টেজ। এরপর চক্ষু রক্তলাল বর্ণ ধারন করে এবং লিভার রেচনতন্ত্র ও অন্ত্রের ক্ষতি করা শুরু করে।

প্রসাবের রং হলুদ হয়ে যাওয়া

প্রস্রাবের রং পরিবর্তন হওয়া জন্ডিসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষণ। সাধারণ মানুষের প্রসাবের রং হালকা হলুূদাভ হতেই পারে। তাই এই বিষয় টিকে কেউ তেমন একটা আমলে নেয় না। প্রস্রাবে ক্রিয়েটিনিন এর মাত্রার ওপর নির্ভর করে প্রস্রাব কতটুকু হলুদ হবে। কিন্তু জন্ডিস হলে যখন আপনার শরীরে বিলিরুবিন বেশি হয়ে যায় তখন রেচনতন্ত্রে সমস্যা হয়। রক্তে বর্জ পদার্থ বেড়ে যায় এবং ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যায়। ফলে প্রস্রাবের রং পরিবর্তন হয়। আগের থেকে বেশি হলুদ দেখায়।

তবে প্রস্রাবের সাথে যদি মুত্রনালীতে প্রদাহ হয় তাহলে সেটি ঝুঁকি বাড়ায়। তাছাড়া গুরুতর অবস্থায় প্রস্রাবের রং হলুদ থেকে ধীরে ধীরে লাল বর্ণ ধারণ করতে পারে। এমন সিচুয়েশনে শুধু ঘরে চিকিৎসা ই যথেষ্ট নয়। যতদ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হবে। লক্ষ রাখবেন প্রসাবের সাথে রক্ত যায় কিনা। তাহলে এটি শুধু জন্ডিস নয়, টিউমর কিংবা ক্যান্সারের পূর্ব লক্ষণ হতে পারে।

শরীরের বর্ণ পরিবর্তন

জন্ডিস হলে চোখ ও প্রসাবের সাথে সাথে পরিবর্তন হতে পারে শরীরের রং ও। প্রথমদিকে চোখ ও মুখ হালকা হলুদ দেখায়। মুখে উজ্জ্বল হলুদাভ আভা দেখায়। কিন্তু কিছুদিন পরই ক্লান্ত ও দুর্বল দেখায়। মুখ গলা ও শররের সেনসিটিভ পার্ট ও হলুদ হতে থাকে। এসময়ে শরীরে ছোট ছোট ফুসকুড়ি ওঠার পসিবিলিটি থাকে।

শরীর হলুদ হয়ে যাওয়ার সাথে যদি লক্ষ করেণ যে আপনার গায়ে লাল বর্ণের ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে। তাহলে এটি নিশ্চিত যে আপনার জন্ডিস হয়েছে। তাছাড়া চোখ হলুদ হবার পর শরীর হলুদ হওয়া শুরু করলে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

শারীরিক দুর্বলতা

জন্ডিস শুরু হলে এবং জন্ডিস শেষ হওয়ার পরও শারীরিক দুর্বলগতা পিছু ছাড়ে না। শরীরে বিভিন্ন অঙ্গের বর্ণ পরিবর্তনের সাথে সাথে শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। এর মধ্যে অন্যতম হল অল্প কাজে হাঁপিয়ে ওঠা। কোনো ভারী কাজ করতে না পারা। যেকোনো কাজ করতে অনীহা। সামান্য কাজেই বুক ধরফর করা ইত্যাদি।

শারীরিক দুর্বলতা
শারীরিক দুর্বলতা

ক্ষুধামন্দা

জন্ডিসের প্রাথমিক লক্ষণ গুলোর মধ্যে ক্ষুধামন্দা অন্যতম। এসময়ে খাবারের প্রতি প্রচুর অনীহা জন্মে। বিশেষ করে মশলা জাতীয় খাবারে বেশি অনীহা হয়ে থাকে। খাবারের গন্ধে বমি আসা কিংবা পেট সারাক্ষণ ভরা ভরা থাকা, ক্ষুধা না লাগা, এসবই জন্ডিসের লক্ষণ বলে বিবেচিত হয়।

তাছাড়া গুরতর অবস্থায় মুখের ভেতরে ঘা সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণেও অনেকে খাবার খেতে চায় না। বিশেষ করে নবজাত বাচ্চাদের এই সমস্যা টা বেশি হতে দেখা দেয়। এমনকি বাচ্চারা মায়ের দুধ খেতেও অনীহা বোধ করে। এসময়ে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

জ্বর জ্বর অনুভূতি কিংবা কাঁপানি দিয়ে জ্বর

জন্ডিস হলে আপনার শরীরে কারণ ছাড়াই জ্বর জ্বর ভাব দেখা দিবে। হঠাৎ করেই শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাবে। কিংবা শরীরের তাপমাত্রা অনেকে বেশি কমে গিয়ে ঠান্ডা অনুভূত হবে। হঠাৎ করেই জ্বর অনুভব হবে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে তাপমাত্রা অত বেশি বাড়ে না। তাই তারা জন্ডিস হবার লক্ষণ আলাদা করতে পারে না।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী থাকতে পারে। জন্ডিসের সাথে জ্বর হওয়া একটি ঝুকিপূর্ণ অবস্থা। এই স্টেজে যাওয়ার আগেই জন্ডিস শনাক্ত করা উচিত।

জ্বর হলে মাথায় পানিপট্টি
ছবিঃ জ্বর হলে মাথায় পানিপট্টি দেওয়া।

বমি বমি ভাব অথবা বমি

কোন কারণ ছাড়াই সারাদিন বমি বমি ভাব হওয়া কিন্তু জন্ডিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষন। এসময়ে খাবারে অনীহা তৈরি হয় ও বমি বমি ভাব হয়৷ অনেকের আবার কিছু খেলেই বমি হয়ে যায়। খাবার পেটে রাখতে পারে না। বড়দের ক্ষেত্রে মশলার গন্ধে বমি হওয়া জন্ডিসের লক্ষণ।

ছোট বাচ্চারদের ক্ষেত্রে খাওয়ার সাথে সাথে বমি করে ফেলা। তরল ছাড়া অন্য কোনো খাবার খেতে না চাওয়া জন্ডিসের প্রাথমিক পর্যায়।

মৃদু বা তীব্র পেট ব্যথা

কিছু খাওয়ার সাথে সাথে পেট ব্যথা শুরু হয়ে যাওয়া বা পেটে জালা পোড়া করা জন্ডিসের লক্ষণ। এছাড়া খাবারের অনীহার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে না খাওয়ার কারনেও পেটে ব্যথা হতে পারে। জন্ডিস হলে যখন বিলিরুবিন বেড়ে যায় তখন লিভার থেকে পিত্ত অপসারিত হতে পারে না৷ এটি পেটে ব্যথা সৃষ্টি করে। যেহেতু জন্ডিসের কারণে রেচনতন্ত্রে সমস্যা হয়, তাই প্রস্রাব পায়খানায় সমস্যা সৃষ্টি হয়। অনিয়মিত রেচন ক্রিয়ার জন্য ও পেট এ ব্যথা হয়।

পায়খানা সাদা হয়ে যাওয়া

শিশুদের ক্ষেত্রে পায়খানা সাদা হয়ে যাওয়া জন্ডিসের একটি লক্ষণ। এটি খুব মারাত্মক অবস্থায় দেখা দেয়। বড়দের ক্ষেত্রেও অনেক সনয়ে লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে যাদের ইমিউনিটি অনেক কম। কিংবা যাদের পরিপাক তন্ত্রে আগে থেকেই কোনো সমস্যা আছে।

চুলকানি

শরীরে বিভিন্ন স্থানে চুলকানি হওয়া, ফুসকুড়ি দেখা দেয়াও জন্ডিসের লক্ষণ। এসময়ে হাতে পায়ে, মাথার ত্বকে, ফেইস ছোট ছোট গোটা হতে দেখা দেয়। এগুলোই পরবর্তী তে চুলকানি সৃষ্টি করে। অনেক সময়ে এগুলো বড় বড় ফুসকুড়ি আকার ধারণ করে। এবং শরীরে চুলকানি ও অশান্তি সৃষ্টি করে।

লিভার শক্ত হওয়া

পেট শক্ত হয়ে যাওয়া, অন্য কথায় লিভার শক্ত হয়ে যাওয়া জন্ডিসের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি। যেহেতু আপনার লিভার থেকে পিত্ত বের হতে পারে না,সেহেতু এগুলে রেচন ক্রিয়ায় বাধা তৈরি করে। এবং পরিপাকতন্ত্রে সমস্যা তৈরি করে। এগুলো শক্ত ও জমাট হয়ে থাকে। যার ফলে যকৃতের প্রাচীর শক্ত অনুভব হয়। নড়াচড়া করতে ও হাঁটাচলা করতে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।

অনিদ্রা

জন্ডিস হলে ঘুম কম হওয়া কিংবা রাতে একেবারেই ঘুম না হতে দেখা যায়। এ সময়ে শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অশান্তির কারণেও ঘুম কম হয়। তাছাড়া ব্রেন খুব বেশি উত্তেজিত থাকে বলে গবেষকরা বলে থাকেন। এ কারণেও ঘুমে ব্যঘাত ঘটে। ঘুম হলেও একটু পর পর ভেঙে যায়।

insomnia
ছবিঃ Insomnia

ওজন কমে যাওয়া

জন্ডিস হলে হঠাৎ করেই ওজন কমে যেতে দেখা যায়। কারণ এসময়ে খাবার খেতে অনীহা জাগে। তাছাড়া শরীরের ভেতরে অনেক বেশি পরিবর্তন আসে। যার কারণে দ্রুত ওজন হ্রাস পেতে দেখা যায়।

জন্ডিসের চিকিৎসা ও প্রতিকার

জন্ডিস নিজে কোনো রোগ নয়, এটি হল অন্য রোগের একটি উপসর্গ। ঘন ঘন জন্ডিস হওয়া মারাত্মক কোনো রোগ কে ইঙ্গিত করে। হবে সাধারণ ক্ষেত্রে জন্ডিস সাত থেকে বারো দিনের মধ্যে কমে যায়। কারণ এসময়ে শরীরে অটোমেটিক বিলিরুবিন এর পরিমাণ ব্যালেন্স হয়ে যায়। তবে জন্ডিস থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসক রা যেসব পরামর্শ দিয়ে থাকেন তা হল-

  • পর্যাপ্ত পরিমানে বিশ্রাম ও ঘুম
  • ভারী কাজ না করা, বিশেষ করে যেসব পেটে চাপ সৃষ্টি করে
  • প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন ও ব্যথার ঔষধ সেবন থেকে বিরত থাকা
  • সহজে হজম করা যায় এমন খাবার খাওয়া
  • ভাইরাল হেপাটাইটিস এর ক্ষেত্রে লিভারে চাপ পরে এমন কোনো কাজ করা যাবে না
  • চিকিৎসকে পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ সেবন করা থেকে বিরত থাকতে হবে

জন্ডিসের প্রতিকার

  • সবসময় পরিস্কার পরিবেশে খাবার প্রস্তুত করুন
  • কোনো কারনে রক্ত নিলে অবশ্য স্ক্রিনিং করিয়ে নিবেন
  • ডিসপোজাল সিরিঞ্জ ছাড়া শরীরে কোনো ইনজেকশন নেয়া যাবে না
  • হেপাটাইটিস বি এর ভেকসিন নেয়া নিশ্চিত করতে হবে
  • অন্য কারো ব্যবহৃত ব্লেড,রেজার খুর ইউজ করা থেকে বিরত থাকবেন
  • বাইরের পানি পান করবেন না
  • পানি ফুটিয়ে খাওয়া চেষ্টা করবেন বা ভাল ভাবে ফিল্টার করে নিবেন
  • প্রচুর পরিমানে তরল খাবার খাবেন


জন্ডিস কি? জন্ডিস রোগের লক্ষণ ও জন্ডিসের প্রতিকার – জন্ডিস রোগীর খাবার ও চিকিৎসা

জন্ডিসের ঘরোয়া চিকিৎসা

জন্ডিস গুরুতর না হলে ঘরে বসেই এর চিকিৎসা নেয়া সম্ভব। তবে ভাল হয় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এরপর ঘরে বসেই ট্রিটমেন্ট নেয়া। জন্ডিসের সবচেয়ে প্রচলিত ঘরোয়া চিকিৎসা ও খাবার সচেতনতা তুলে ধরলাম-

পানি

জন্ডিসে আক্রান্ত হলে প্রচুর পরিমানে পানি পান করতে হবে। এতে শরীরের ইমিউনিটি আরো বেশি বাড়বে। শরীরে ডিহাইড্রেশন হবার ঝুঁকি কমবে। তাছাড়া রেচন ক্রিয়ায় ও পানি উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখবে। এজন্য জন্ডিস হলে প্রতিদিন কমপক্ষে আট থেকে দশ গ্লাস পানি পান করতে হবে। প্রয়োজনে পানির সাথে স্যালাইন, গ্লুকোজ ইত্যাদি মিলিয়ে পান করতে হবে।

দ্রুত হজকারী খাবার

যেসব খাবার হজম হতে খুব বেশি সময় লাগে না, সেই সব খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। যেমন জুস, স্যুপ, ভেজিটেবল, তরল খাবার, যেকোনো সবজি কম মশলা ও ঝোল করে খাওয়া৷ মশলাজাত ও তৈলাক্ত সবজি না খাওয়া। এসময়প খাবারে হলুদ পরিহার করা উচিত কারণ জন্ডিস হলে রোগীর এই গন্ধ নিতে পারে না।

ইমিউনিটি বাড়ায় এমন খাবার

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এমন খাবার খাওয়া খুবই জরুরি। কারণ এ এসময়ে দেহে অনেক ধরনের শারীরিক পরিবর্তন আসে। তাই এগুলোর সাথে ফাইট করতে হলে আপনার প্রয়োজন পরবে শক্তির৷ তাই ডিম, দুধ, মধু, প্রোটিন, ফল, শাকসবজি খেতে হবে।

ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার

পেটের যেকোনো রোগে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া খুবই জরুরি। এটি দ্রুত হজমে সাহায্য করে। তাই জন্ডিস হলে ডাক্তার রা বাদাম, সবজি, ওটমিল এসব খাবার খেতে পরামর্শ দেন।

হারবাল টি

হারবাল টি জন্ডিস রোগীদের জন্য খুবই উপকারী একটি পানীয়। এতে থাকে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি কারী অনেক উপাদান। তাছাড়া হারবাল টি আপনার হজমের জন্য খুবই উপযোগী।

চিনি

চিনি জন্ডিস রোগের জন্য একটি উপকারী উপাদান। তবে সরাসরি চিনি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। চিনির বদলে আখের রস, আখের গুড়, গুড়ের শরবত ইত্যাদি খেতে হবে। অবশ্যই বাড়িতে এসব পানীয় তৈরি করে পান করবেন। বাইরেী খাবার পরিহার করবেন৷

পুদিনা পাতা

জন্ডিস রোগ থেকে মুক্তি পেতে পুদিনা পাতা খুবই ভাল কাজ করে। এটি যকৃতের বিভিন্ন ফাংশনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। তাই ডেইলি চার থেকে পাঁচটি পুদিনা পাতা খেতে হবে। তবে কোনো জুসের মধ্যে পুদিনা পাতা ব্লেন্ড করে খাওয়াটা বেশি কার্যকর।

লেবু

লেবু ইমিউনিটি বাড়ানো থেকে শুরু করে রুচিতে পরিবর্তন আনতে ব্যপক সাহায্য করে। তাছাড়া যকৃত জমে যাওয়া পিত্তরস পরিশুদ্ধ করতে লেবু বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। প্রতিদিন একটি থেকে দুটি লেবু পানির সাথে কিংবা খাবারের সাথে খেতে পারেন। তবে এর বেশি লেবু খেতে প্রেসার লো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেহেতু জন্ডিস রোগী আগে থেকেই দুর্বল থাকে তাই অতিরিক্ত লেবু খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

টক দই

এসময়ে চিনি দিয়ে টক দই খেলে বেশ ভাল ফল পাওয়া যায়। কারন এটি হজমে সাহায্য করে। রেচন ক্রিয়া সচল রাখতে সহায়তা করে। তবে মনে রাখতে হবে মিষ্টি দই গ্রহন করা যাবে না। তাহলে পেট খারাপ বা ডিসেন্ট্রি হয়ে যেতে পারে। টক দই এর মধ্যে ব্রাউন চিনি বা আখের রস দিয়ে খেতে পারেন।

আনারস

লিভার থেকে পিত্ত রস রুপে জমে থাকা বিলিরুবিন বের করে দিতে আনারসের জুরি নেই। তাই এসময়ে রোগীকে আনারস কেটে খাওয়াতে হবে। কিংবা জুস করে খাওয়াতে হবে। তবে জুস অবশ্যই ঘরে পরিস্কার পরিবেশ বানানোর চেষ্টা করবেন।

বাজারে আনারস
বাজারে আনারস

বাচ্চাদের জন্ডিস

নবজাতকের জন্মের পর প্রায় সত্তর থেকে আশি পার্সেন্ট বাচ্চার জন্ডিস হয়ে থাকে। তবে এর অর্ধেক ই থাকে স্বাভাবিক স্টেজে। কারণ বাচ্চাদের লিভার সম্পূর্ণ রুপে কাজ করতে একটু সময় লাগে। তাই বিলিরুবিন এর পরিমাণ একটু বেশি থাকে। তবে এটি স্বাভাবিক হয়ে যায় দ্রুতই।

এই সময়ে বাচ্চাকে মায়ের দুধ খাওয়ানো সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। তবে বাচ্চা যদি ছয় মাসের উর্ধ্বে হয় তাহলে তরল খাবার, ফলের রস দেয়া যেতে পারে। তবে সেটিও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পান করাতে হবে।

পরিশেষে

কোন রোগই অবহেলা করার মত নয়। সামান্য রোগের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে কোনো মরণব্যাধি রোগের বীজ। তেমনি একটি রোগ জন্ডিস। প্রতি বছর বহু লোক জন্ডিসে আক্রান্ত হয়, বিশেষ করে শিশুরা। আর নবজাতকের জন্য এগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই জন্ডিসের লক্ষণ গুলো সময়মত মিলিয়ে নিতে হবে। আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও প্রতিকার গ্রহণ করতে হবে। তবেই জন্ডিস থেকে মুক্তির আশা করা যায়।

Author

You cannot copy content of this page